قال رحمه الله: " الصوم ضربان واجب ونفل والواجب ضربان منه ما يتعلق بزمان بعينه كصوم رمضان والنذر المعين فيجوز بنية من الليل وإن لم ينو حتى أصبح أجزأته النية ما بينه وبين الزوال " وقال الشافعي رضي الله عنه لا يجزيه.
اعلم أن صوم رمضان فريضة لقوله تعالى: {كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ} [البقرة: 183] وعلى فرضيته انعقد الإجماع ولهذا يكفر جاحده والمنذور واجب لقوله تعالى: {وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ} [الحج: 29] وسبب الأول الشهر ولهذا يضاف إليه ويتكرر بتكرره وكل يوم سبب لوجوب صومه وسبب الثاني النذر والنية من شرطه وسنبينه ونفسره إن شاء الله تعالى وجه قوله في الخلافية قوله عليه الصلاة والسلام " لا صيام لمن لم ينو الصيام من الليل " ولأنه لما فسد الجزء الأول لفقد النية فسد الثاني ضرورة أنه لا يتجزأ بخلاف النفل لأنه متجزئ عنده.
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন] রোজা দু'প্রকার। ওয়াজিব ও নফল। আবার ওয়াজিব দু'প্রকার। এক প্রকার হলো নির্ধারিত সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন- রমজানের রোজা এবং দ্বিতীয় প্রকার হলো নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজা। এ প্রকারের রোজা রাতে নিয়ত করার দ্বারা জায়েজ হয়। আর যদি নিয়ত না করে অথচ ভোর হয়ে যায়, তাহলে ভোর ও দ্বি-প্রহরের মধ্যবর্তী সময়ে নিয়ত করলেও যথেষ্ট হবে। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, তা যথেষ্ট হবে না। জেনে রাখা উচিত যে, রমজানের রোজা হলো ফরজ। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- كتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ "তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।” তা ছাড়া রোজা ফরজ হওয়া সম্পর্কে ইজমা সংঘটিত হয়েছে। এজন্যই রমজানের রোজা অস্বীকারকারীকে কাফির সাব্যস্ত করা হয়। মান্নতের রোজা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন- وَلْيَوْنُوا نُذُورَهُمْ "তারা যেন তাদের মান্নতসমূহ পুরা করে।" প্রথমটির সবব হলো [রমজান মাসের উপস্থিতি। এ কারণেই উক্ত রোজাকে মাসের দিকে সম্বোধন করা হয় এবং মাসের পুনরাগমনে রোজারও পুনরাগমন ঘটে। আর রমজানের প্রতিটি দিন হচ্ছে সেই দিনের রোজা ফরজ হওয়ার সবব।
দ্বিতীয় প্রকারের রোজা ওয়াজিব হওয়ার কারণ হচ্ছে মান্নত করা। আর নিয়ত হচ্ছে তার জন্য শর্ত। ইন্শাআল্লাহ এ বিষয়ে সামনে বিশদ আলোচনা করব। বিরোধপূর্ণ বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর বক্তব্যের প্রমাণ হলো, রাসূলুল্লাহ - এর বাণী - لَا صِيَامَ لِمَنْ لَمْ يَنْوِ القِيَامَ مِنَ اللَّيْلِ "যে ব্যক্তি রাত্রে রোজার নিয়ত করেনি, তার রোজা নেই।” তা ছাড়া নিয়ত না থাকার কারণে রোজার প্রথম অংশটুকু যখন ফাসেদ হয়ে গেল তখন দ্বিতীয় অংশটুকুও অনিবার্যভাবে ফাসেদ হয়ে যাবে। কেননা, [ফরজ রোজা বিভক্তিযোগ্য নয়। নফলের বিষয়টি এর বিপরীত। কারণ, নফল রোজা তাঁর মতে বিভক্তিযোগ্য।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
قَوْلَهُ الصَّوْمُ ضَرْبَانِ الحَ : শায়খ আবুল হাসান কুদূরী (র.) রোজার প্রকার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, রোজা দুই প্রকার। যথা- ১. ওয়াজিব, ২. নফল। অথচ রোজা তিন ভাগে বিভক্ত। ১. ফরজ, ২. ওয়াজিব, ৩. নফল। অর্থাৎ ওয়াজিব নয়- যা সুন্নত, মোস্তাহাব এবং নফলসহ সবগুলোকে শামিল করে। এর জবাব এই যে, ওয়াজিব শব্দটি ফরজ এবং ওয়াজিব উভয়টিকে শামিল করে। কেননা, ওয়াজিব সাবিত (প্রমাণ)-এর অর্থে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং যদি অকাট্য দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয় তাকে ফরজ বলা হয় আর যদি সন্দেহসূচক দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয় তবে তাকে ওয়াজিব বলা হয়। কুদূরী গ্রন্থকার উভয়টি বুঝানোর জন্য শুধু ওয়াজিব। সাবিত) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অতঃপর ওয়াজিব দুই প্রকার- ১. মু'আইয়্যান, ২. গায়রে মু'আইয়্যান। অর্থাৎ প্রথমটি হলো এমন রোজা যা কোনো নির্ধারিত দিনের সাথে যুক্ত। যেমন- রমজানের রোজা ও নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজা। যেমন- কেউ বলল, আমার উপর আল্লাহর ওয়াস্তে এই মাসের প্রথম জুমার রোজা আবশ্যক। এতে এই মাসের প্রথম জুমার রোজা নির্ধারিত হয়ে গেল। দ্বিতীয়টি হলো এমন রোজা যা কোনো নির্ধারিত দিনের সাথে যুক্ত নয়। যেমন- রমজানের কাজা রোজা যার কোনো নির্ধারিত ওয়াক্ত নেই; বরং নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া যে-কোনো দিন কাজা করতে পারে ইমাম কুদূরী (র.) প্রথমত নির্ধারিত ওয়াজিবের (وَاجِبْ مُعَيِّن) আহকাম আলোচনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন-রমজানের রোজা ও নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজা অন্যান্য রোজার ন্যায় রাত্রে নিয়ত করার দ্বারা জায়েজ হয়ে যাবে। যদি রমজানের রোজা আর নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজার নিয়ত রাত্রে না করা হয়, এমনকি ভোর হয়ে যায়। তবে ভোর ও জাওয়ালের মধ্যবর্তী সময়ে যদি করে নেওয়া হয় তবুও জায়েজ হবে। ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, যদি রমজানের রোজা কিংবা নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজার নিয়ত রাত্রে না করা হয়; বরং ভোর হওয়ার পর করা হয় তবে জায়েজ হবে না। তবে নফল রোজার নিয়ত ভোরের পর করাও জায়েজ আছে। এটাই ইমাম আহমদ (র.)-এর অভিমত। ইমাম মালিক (র.)-এর মতে, ফরজ এবং নফল সকল রোজার জন্য রাত্রে নিয়ত করা শর্ত। যদি ভোরের পর নিয়ত করা হয় তবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
হিদায়া গ্রন্থকার বিরোধপূর্ণ মাসআলায় উভয় দলের দলিল-প্রমাণ বর্ণনার পূর্বে ভূমিকা হিসেবে কিছু জরুরি বিষয়ের আলোচনা করেছেন। প্রথম হলো, রমজানের রোজা ফরজ। আর ফরজ হওয়ার ব্যাপারে দলিল হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী- كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّبَامُ এবং উম্মতের ইজমা। এ কারণেই রমজানের রোজার ফরজিয়তের অস্বীকারকারী কাফির হিসেবে গণ্য হয়।
নজরের রোজা ওয়াজিব। দলিল হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী- وَلْيُوفوا نُذُورَهم কেননা وليوفوا শব্দটি আমরের সীগাহ্। আর 'আমর' দ্বারা ওয়াজিব বুঝা যায়। হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, রমজানের রোজার সবব হলো রমজান মাসের উপস্থিতি। এ কারণেই সাওমকে রমজানের দিকে ইজাফত [সম্বন্ধ) করে সাওমে রমজান বলা হয়। আর ইজাফত সবব হওয়ার আলামত বহন করে। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, সাওমে রমজানের সবব হলো রমজান মাসের উপস্থিতি। আর যেহেতু সবব তথা মাসের তাকরার দ্বারা মুসাব্বাব তথা রোজারও তাকরার হয় এজন্য রমজান মাসের পুনরাগমন দ্বারা রমজানের রোজারও পুনরাগমন ঘটে। কোনো কোনো মাশায়েখ এটা গ্রহণ করেছেন যে, রমজানের মাস রমজানের রোজার সবব। আল্লামা ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক দিনের রোজা ওয়াজিব হওয়ার সবব হলো ঐ দিন। কেননা রমজানের রোজা হলো বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের অনুরূপ। এজন্য যে, দুই দিনের মাঝখানে এমন একটি অতিরিক্ত সময় (রাত] আসে যার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে রোজা রাখার যোগ্যতা নেই। আদায়েরও নেই, কাজারও নেই। সুতরাং রমজানের রোজা নামাজের অনুরূপ হয়ে গেল। তাই যেমনিভাবে প্রত্যেক নামাজের সবব ঐ নামাজের ওয়াক্ত আসা, তেমনিভাবে প্রত্যেক দিন ঐ দিনের রোজার সবব হবে। হিদায়া গ্রন্থকার উভয় মতকে একত্রিত করেছেন। কেননা, উজুব দুই প্রকার। একটি হলো নাসেক্স উজ্ব [সত্তাগতভাবে দরকারী। দ্বিতীয়টি হলো উজবে আদা [আদায়ের দিক থেকে দরকারী।। সুতরাং রমজান মাস সবব হলো রোজা সত্তাগতভাবে ওয়াজিব হওয়ার। আর প্রত্যেক দিন সবব হলো ঐ দিনের আদায় ওয়াজিব হওয়ার। হিদায়া গ্রন্থকারের উপরিউক্ত ব্যাখ্যার পর উতয় মতামতে আর কোনো বিরোধ থাকে না।
নজরে মু'আইয়ান তথা নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজার সবব হলো মান্নত করা। আর নিয়ত তার শর্ত। ইনশাআল্লাহ রোজার সকল শর্তের আলোচনা সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হবে। হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, মতনের (৩) মাসআলাটি বিরোধপূর্ণ। অর্থাৎ ঐ মাসআলার মধ্যে আমাদের মতে দ্বি-প্রহরের পূর্বে নিয়ত করা জায়েজ। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে রাত্রে নিয়ত করা জরুরি। জাওয়ালের পূর্বে যদি নিয়ত করা হয় তবে গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিল নিম্নোক্ত হাদীস- لَا صِيَامَ لِمَنْ لَمْ يَنْوِ الصِّيَامَ مِنَ اللَّيْلِ “যে ব্যক্তি রাতে রোজার নিয়ত করেনি তার রোজাই হলো না।" দ্বিতীয় দলিল এই যে, যদি রাত্রে অর্থাৎ সুবহে সাদেকের পূর্বে রোজার নিয়ত না করে তখন রোজার প্রথমাংশ অর্থাৎ ঐ অংশ যার মধ্যে নিয়ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নিয়ত যা শর্ত ছিল তা না পাওয়া যাওয়ার কারণে ফাসেদ হয়ে গেল। আর রোজার প্রথমাংশ যখন ফাসেদ হয়ে গেল তখন দ্বিতীয়াংশ তথা ঐ অংশ যার মধ্যে নিয়ত পাওয়া গেছে তাও ফাসেদ হয়ে যাবে। কেননা, রোজা বিভক্তিযোগ্য নয় যে, তার এক অংশ ঠিক আর অপর অংশ বেঠিক। সুতরাং যখন রোজা বিভক্তিযোগ্য নয় তখন দ্বিতীয়াংশের বেনা প্রথমাংশের উপর ঠিক হবে। আর প্রথমাংশ নিয়ত না পাওয়া যাওয়ার কারণে ফাসেদ। আর কায়েদা আছে যে, ফাসেদ জিনিসের উপর বেনা করাও ফাসেদ হয়। এজন্য পুরা রোজা ফাসেদ হয়ে যাবে। আর যখন রাত্রে নিয়ত না করার কারণে রোজা ফাসেদ হয়ে গেল, বুঝা গেল রাত্রে নিয়ত করা শর্ত এবং জরুরি। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে নফল রোজার মধ্যে রাত্রে নিয়ত করা শর্ত নয়। কেননা নফল রোজা তাঁর মতে বিভক্তিযোগ্য। সুতরাং যে অংশ নিয়ত ছাড়া হবে সেটি ফাসেদ আর যে অংশ নিয়তের সাথে হবে তা ঠিক বলে গণ্য হবে।
ولنا قوله صلى الله عليه وسلم بعدما شهد الأعرابي برؤية الهلال "ألا من أكل فلا يأكلن بقية يومه ومن لم يأكل فليصم " وما رواه محمول على نفي الفضيلة والكمال أو معناه لم ينو أنه صوم من الليل ولأنه يوم صوم فيتوقف الإمساك في أوله على النية المتأخرة المقترنة بأكثره كالنفل وهذا لأن الصوم ركن واحد ممتد والنية لتعيينه لله تعالى فتترجح بالكثرة جنبة الوجود بخلاف الصلاة والحج لأن لهما أركانا فيشترط قرانها بالعقد على أدائهما وبخلاف القضاء لأنه يتوقف على صوم ذلك اليوم وهو النفل وبخلاف ما بعد الزوال لأنه لم يوجد اقترانها بالأكثر فترجحت جنبة الفوات ثم قال في المختصر ما بينه وبين الزوال وفي الجامع الصغير قبل نصف النهار وهو الأصح لأنه لا بد من وجود النية في أكثر النهار ونصفه من وقت طلوع الفجر إلى وقت الضحوة الكبرى لا إلى وقت الزوال فتشترط النية قبلها لتتحقق في الأكثر ولا فرق بين المسافر والمقيم عندنا خلافا لزفر رحمه الله لأنه لا تفصيل فيما ذكرنا من الدليل
অনুবাদ: আমাদের দলিল এই যে, জনৈক বেদুইন চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদানের পর রাসূলুল্লাহ বলেছেন- إِلَّا مَنْ أَكَلَ فَلَا يَأْكُلْنَ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ وَمَنْ لَمْ يَأْكُلُّ فَلْيَصُمٌ "শোন, যে ব্যক্তি পানাহার করে ফেলেছে, সে যেন অবশিষ্ট দিন পানাহার না করে। আর যে পানাহার করেনি, সে যেন রোজা রাখে।" আর ইমাম শাফেয়ী (র.) বর্ণিত হাদীসটি পূর্ণতা ও ফজিলত অর্জিত না হওয়ার উপর প্রযোজ্য। কিংবা এর অর্থ এই যে, সে এই নিয়ত করেনি যে, তার রোজা রাত্র থেকে শুরু হবে। তা ছাড়া যৌক্তিক কারণ এই যে, এটা হলো রোজার জন্য নির্ধারিত দিন। সুতরাং প্রথমাংশের পানাহার থেকে বিরত থাকাটা বিলম্বিত নিয়তের উপর নির্ভরশীল হবে, যা উক্ত রোজার অধিকাংশের সঙ্গে যুক্ত। যেমন নফলের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এর কারণ এই যে, রোজা হচ্ছে একটি দীর্ঘায়িত রুকন। আর নিয়তের প্রয়োজন হলো সেটাকে আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে। সুতরাং আধিক্যের দ্বারা রোজার অস্তিত্বের দিকটি অগ্রাধিকার লাভ করবে। নামাজ ও হজের বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা নামাজ ও হজ হচ্ছে কয়েকটি রুকন সমন্বিত। সুতরাং নিয়ত ঐ চুক্তির সাথে যুক্ত হওয়া শর্ত হবে যা উভয়টির আদায়ের জন্য ফরজ হয়েছে। কাজা রোজার বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা, তা ঐ দিনের রোজার উপর নির্ভরশীল। আর ঐ রোজাটি হলো নফল। [সুতরাং নফল রোজার সময় আরম্ভ হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ রাত্রে নিয়ত না করলে দিনের বেলায় নিয়তের দ্বারা নফলকে কাজা হিসেবে রূপান্তরিত করা যাবে না। জাওয়ালের পরে নিয়ত করার বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা, সেক্ষেত্রে রোজার নিয়তটি দিনের অধিকাংশের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ফলে রোজা ফউত হওয়ার ছুটে যাওয়ার দিকটি অগ্রাধিকার লাভ করবে।
'মুখতাসারুল কুদূরীতে' [নিয়ত গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে ভোর ও জাওয়ালের মধ্যবর্তী সময়ের কথা বলা হয়েছে আর 'জামেউস্ সগীর' কিতাবেও অর্ধ দিবসের পূর্বের কথা বলা হয়েছে। এটাই বিশুদ্ধ অভিমত। কেনন দিবসের অধিকাংশ সময় নিয়ত বিদ্যমান থাকা জরুরি। আর [শরিয়ত মতে দিবসের অর্ধেক হলো ফজরের উদয় থেকে বৃহৎ পূর্বাহ্ন পর্যন্ত; জাওয়ালের সময় পর্যন্ত নয়। সুতরাং এর পূর্বেই নিয়ত বিদ্যমান হওয়া জরুরি, যাতে নিয়ত দিবসের অধিকাংশে বিদ্যমান থাকে। [দিবসের নিয়ত গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে) মুসাফির ও মুকামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা আমাদের বর্ণিত দলিলে কোনো পার্থক্য নির্দেশ নেই। অবশ্য ইমাম জুফার (র.) ভিন্নমত পোষণ করেন।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বললেন, যে আমাদের দলিল, যখন একজন বেদুইন ব্যক্তি রমজানের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য প্রদান করল, তখন রাসূলুল্লাহ ব্যক্তি কিছু পানাহার করেছে সে যেন অবশিষ্ট দিন পানাহার না করে। আর যে ব্যক্তি পানাহার করেনি সে যেন রোজা রাখে। অর্থাৎ রোজা রাখার নিয়ত করে। উক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা গেল, ভোরের পর নিয়ত করা জায়েজ। মোল্লা আলী কারী (র.)-এর মতানুযায়ী 'শরহে নিকায়া' গ্রন্থকারের উপরিউক্ত হাদীস অপ্রসিদ্ধ )غَيْرُ مَعْرُوف(, তবে সুনানে আরবা'আ তথা চার সুনানের কিতাবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর নিম্নোক্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে-
قَالَ جَاءَ أَعْرَابِيُّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ قَالَ الْحَسَنُ فِي حَدِيْثِهِ يَعْنِي رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قَالَ نَعَمْ قَالَ أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ قَالَ نَعَمْ قَالَ يَا بِلَالُ أَذَنْ فِي النَّاسِ فليصوموا
অর্থ- হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন। রাসূলুল্লাহ-এর দরবারে একজন বেদুইন আসল। সে বলল, আমি চাঁদ দেখেছি, হাসান তার হাদীসে বর্ণনা করেছেন "রমজানের চাঁদ। রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই? সে বলল, জি হ্যাঁ। তিনি বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল? সে বলল, জি-হ্যাঁ। তিনি বললেন, বেলাল লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যাতে তারা রোজা রাখে।
উক্ত হাদীসটিও আমাদের সুস্পষ্ট দলিল হয় না। কেননা হাদীসটির মধ্যে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই যে, শাহাদাতের এই ঘটনা চাঁদ দেখার পর রাত্রেই ঘটেছে নাকি পূর্বের দিন ভোরে ঘটেছে। যদি রাত্রে ঘটে থাকে তবে রেওয়ায়েতটি আমাদের দলিল হয় না।
আর যদি পূর্বের দিন ভোরে ঘটে থাকে তবে নিশ্চিতভাবে আমাদের দলিল হবে। কেননা পূর্বের দিন ভোরে উক্ত ঘটনা ঘটার অর্থ এই যে, ভিনি সেদিনের রোজা রাখতেই নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ঐ দিনের এই রোজা রাত্রের নিয়ত দ্বারা হবে না; বরং ভোরের পরের নিয়ত দ্বারাই হবে। যখন নিয়ত ভোরের পর করা হয়েছে তখন প্রমাণিত হলো যে, রাত্রে নিয়ত করা শর্ত নয়। আমাদের মাজহাবের সমর্থনে সুস্পষ্ট হাদীস হলো যা হযরত সালামাহ ইবনে আকওয়া' (রা.) সূত্রে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (র.) রেওয়ায়েত করেছেন। হাদীসটি হলো-
أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ رَجُلًا مِنْ أَسْلَمَ اَذِنْ فِي النَّاسِ أَنَّ مَنْ أَكَلَ فَلْيَصُمْ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ وَمَنْ لَمْ يَكُنْ أَكَلَ فَلْيَصُمْ فَإِنَّ الْيَوْمَ يَوْمَ عَاشُورَاء
অর্থ-রাসূলুল্লাহ আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছেন, সে যেন লোকদের মাঝে এই মর্মে ঘোষণা করে যে, যে কিছু পানাহার করেছে সে যেন অবশিষ্ট দিন রোজা রাখে আর যে পানাহার করেনি সেও যেন রোজা রাখে অর্থাৎ রোজা রাখার নিয়ত করে। কেননা এই দিনটি হলো আশুরার দিন।
এই ঘটনাটি তখনকার যখন আশুরার রোজা ফরজ ছিল এবং রমজানের রোজা ফরজ হওয়া দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়নি। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ফরজ রোজার নিয়ত দিনে করাও জায়েজ।
ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর পেশকৃত হাদীস- لَا صِيَامَ لِمَنْ لَمْ يَنْرِ الصِّيَامَ مِنَ اللَّيْلِ -এর জবাব এই যে, উক্ত হাদীসের মধ্যে মূল রোজার নফী করা হয়নি; বরং রোজার ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গতার নফী করা হয়েছে। অর্থাৎ যদি রাত্রে রোজার নিয়ত না করে তবে রোজা ফজিলতপূর্ণ ও পরিপূর্ণ হবে না। তবে মূল রোজা আদায় হয়ে যাবে। যেমন- لَا صَلوٰةَ لِجَارِ الْمَسْجِدِ إِلَّا فِي الْمَسْجِدِ -এর মধ্যে নামাজের পূর্ণতা ও ফজিলতের নফী করা হয়েছে। মূল নামাজ এবং নামাজ ঠিক হওয়ার নফী করা হয়নি। দ্বিতীয় জবাব এই যে, উক্ত হাদীসের মতলব হলো ঐ ব্যক্তির রোজা হবে না, যে এই নিয়ত করেনি যে, সে রাত্র থেকে রোজাদার। মোট কথা হলো, এক ব্যক্তি যে দিনে নিয়ত করেছে, কিন্তু এই নিয়ত করেনি যে, আমার এই রোজা রাত্র তথা সুবহে সাদেক থেকে শুরু হবে; বরং যে সময় নিয়ত করেছে ঐ সময় থেকে রোজার নিয়ত করেছে। উল্লেখ্য যে, এই রোজা জায়েজ হবে না। কেননা ঐ রোজা গ্রহণযোগ্য হবে, যা সুবহে সাদেক থেকে হয়।
আমাদের পক্ষ থেকে আকলী দলিল এই যে, রমজান ও নির্দিষ্ট মান্নতের (نذر مُعَيَّن) দিন তো রোজারই দিন। কেননা, ঐ দিনে রোজা রাখা ফরজ। সুতরাং যখন এই দিন রোজার জন্য নির্ধারিত তখন দিনের প্রথমাংশে যে ইমসাক তথা পানাহার এবং সহবাস থেকে বিরত থাকা পাওয়া গিয়েছে তা ঐ নিয়তের উপর নির্ভরশীল হবে যা বিলম্বিত এবং দিনের অধিকাংশ সময়ের সাথে যুক্ত। যেমন- নফল রোজার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তি সুবহে সাদেকের পূর্বে পানাহার এবং সহবাস থেকে বিরত থাকে তবে এই বিরত থাকা আগামী নিয়তের উপর নির্ভরশীল হবে। সুতরাং যদি সে আগামী রোজার নিয়ত করে এবং এখনো দিনের অধিকাংশ সময় অবশিষ্ট আছে। তখন বলা হবে যে, দিনের প্রথমাংশের ইমসাকও রোজা। আর যদি আগামীতে রোজা ভাঙ্গার নিয়ত করে তখন বলা হবে যে, শুরুর ইমসাকও রোজা ছিল না। সুতরাং জানা গেল যে, শুরুর ইমসাক আগামীর নিয়তের উপর নির্ভরশীল হয়।
হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, দিনের শুরুর ইমসাক আগামী নিয়তের উপর নির্ভরশীল হয়। কেননা রোজা হচ্ছে একটি দীর্ঘায়িত রুকন। তবে এর মধ্যে এ সম্ভাবনা বিদ্যমান আছে যে, এই রুকনটি আদত হিসেবে [স্বভাবগতভাবে) হবে। আবার রোজা হিসেবে হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং এটা নির্ধারণ করা যে, এ ইমসাকটা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইবাদতের নিয়তের মাধ্যমে হতে পারে; স্বভাবগত নয়। এ কথাটি এজন্য বলা হয়েছে যে, দিনের শুরুর ইমসাক আগামীর নিয়তের উপর নির্ভরশীল। এখন এই নিয়ত যদি দিনের অধিকাংশে পাওয়া যায় তবে যেহেতু অধিকাংশ পূর্ণের স্থলবর্তী হয় এজন্য আধিক্যের কারণে অস্তিত্বের দিকটিকে অনস্তিত্বের দিকের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে বলা হবে যে, নিয়ত পুরো দিনে পাওয়া গিয়েছে। আর যখন পুরো দিনে নিয়ত পাওয়া গিয়েছে তখন রোজা জায়েজ হবে। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, রোজার নিয়ত রাত্রে করা জরুরি নয়। এর বিপরীত হলো নামাজ ও হজের বিষয়টি। এগুলোর মধ্যে শুরু থেকে নিয়ত করা জরুরি। এগুলোর মধ্যে الْكُلِّ অধিকাংশ পূর্ণের স্থলবর্তী।-এর কায়েদা প্রযোজ্য হয় না। কেননা, এগুলো বহু রুকন সমন্বিত। যেমন- নামাজের মধ্যে কিয়াম, রুকু, সিজদা এবং কেরাত ইত্যাদি রুকন। আর হজের মধ্যে উকূফে আরাফা [আরাফায় অবস্থান] এবং তওয়াফ রুকন। এখন যদি তাকবীরে তাহরীমার সময় নামাজের প্রারম্ভে নামাজের নিয়ত না করা হয় এবং ইহ্রামের সময় হজের প্রারম্ভে হজের নিয়ত না করা হয়, তখন কিছু কিছু রুকন নিয়ত ছাড়া থেকে যাবে। আর যে সকল রুকন নিয়তবিহীন আদায় হবে সেগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনকি ঐ রুকনগুলো ব্যতিরেকে নামাজ ও হজ আদায় হবে না। এজন্য হজ ও নামাজ উভয়টির শুরুতে নিয়ত করা জরুরি। পরবর্তীতে যদি নিয়ত করা হয় তবে গ্রহণযোগ্য হবে না।
قَوْلُهُ بِخِلَافِ الْقَضَاءِ الحَ এই ইবারতটি দ্বারা একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটি হলো এই যে, রোজা যদি একটি দীর্ঘায়িত রুকন হয় এবং মধ্যাহ্নের পূর্বে নিয়ত করা জায়েজ হয় তবে তো রমজানের রোজার কাজা আদায়ের ক্ষেত্রেও মধ্যাহ্নের পূর্বে নিয়ত জায়েজ হওয়া দরকার ছিল। অথচ ব্যাপারটি এমন নয়; বরং রমজানের কাজা আদায়ের ক্ষেত্রে রাত্রে নিয়ত করা শর্ত। এর জবাব হলো, রমজানের রোজা ও নির্দিষ্ট মান্নতের রোজা ব্যতীত সমস্ত দিন নফল রোজার জন্য প্রবর্তিত-নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া। অর্থাৎ শরিয়ত ঐ দিনগুলোর রোজা তার উপর অপরিহার্য করেনি। তবে নফল রোজার কথা ভিন্ন। সুতরাং রমজানের রোজা ও নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজার দিনগুলো ছাড়া অন্যগুলোর মধ্যে ইমসাক তথা খানা-পিনা এবং সহবাস থেকে বিরত থাকা ঐ দিনের রোজার উপর নির্ভরশীল হবে। ঐ দিনের রোজা নফল। তাই ঐ দিনের রোজা নফল হিসেবে গণ্য হবে। তবে যদি দিনের শুরু থেকে অর্থাৎ সুবহে সাদেক থেকেই কাজা ইত্যাদি রোজার নিয়াত করে। সুতরাং বুঝা গেল যে, কাজা রোজার নিয়ত রাত্রে করা শর্ত। যদি সুবহে সাদেকের পর মধ্যাহ্নের পূর্বে নিয়ত করা হয় তবে তা অগ্রাহ্য হবে।
قوْلَهُ وَبِخَلَافِ مَا بَعْدَ الزَّوَالِ الحَ এই ইবারতটুকু দ্বারাও একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নটি হলো, যখন রোজা একটি দীর্ঘায়িত রুকন, তখন নিয়তের সম্পর্ক দিনের কমবেশি উভয় অংশের সাথে সমান হওয়া উচিত। অর্থাৎ নিয়ত দিনের অধিকাংশে পাওয়া যাক বা অল্পাংশে পাওয়া যাক, যদি মধ্যাহ্নের পর নিয়ত করা হয়, তবে উভয় সুরতে রোজা সিদ্ধ হওয়া উচিত। অথচ মধ্যাহ্নের পর নিয়ত করার দ্বারা রোজা জায়েজ হয় না। এর উত্তর এই যে, আসল তো ছিল, নিয়ত দিনের শুরু ভাগে করা। অর্থাৎ সুবহে সাদেক হওয়ার সাথে সাথেই রোজার নিয়ত করা। কিন্তু যদি দিনের অধিকাংশের সাথে নিয়তের সম্পর্ক পাওয়া যায় তথা মধ্যাহ্নের পূর্বেই নিয়ত করা হয় তবে 'অধিকাংশ পূর্ণের হুকুমে' এই নীতির কারণে এই আমলকে আমরা ছেড়ে দিয়েছি আর যেহেতু মধ্যাহ্নের পর নিয়ত করার সুরতে দিনের অধিকাংশের মধ্যে নিয়ত পাওয়া যায় না সেহেতু এই সুরতে অনস্তিত্বের দিকটি অগ্রাধিকার লাভ করবে এবং বলা হবে, যেন পুরো দিনেই নিয়ত পাওয়া যায়নি। আর রোজা নিয়ত ছাড়াই রেখেছে। উল্লেখ্য যে, নিয়ত ছাড়া রোজা গ্রহণযোগ্য হয় না। এজন্য মধ্যাহ্নের পর নিয়ত করার সুরতেও রোজা গ্রহণযোগ্য হবে না।
قَوْلُهُ قَالَ فِي الْمُحْتَصَرِ الحَ-এর দ্বারা হিদায়া গ্রন্থকার কুদূরী ও জামে সগীরের ইবারতের পার্থক্য বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন, কুদূরীর মতন হলো- إِذَا لَمْ يَنْوِ حَتَّى أَصْبَحَ أَجْزَأَتْهُ النِّيَّةُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الزَّوَالِ "কেউ যদি রাত্রে নিয়ত না করে, আর ভোর হয়ে যায়, তবে সে মধ্যাহ্ন তথা সূর্য হেলে যাওয়ার পূর্বে নিয়ত করে নেবে।" জামে সগীরের মতন হলো- قَبْلَ نِصْفِ النَّهَارِ "অর্ধ দিনের পূর্বে নিয়ত করবে।” হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, জামে সগীরের ইবারত অধিক বিশুদ্ধ। কেননা রোজার মধ্যে শরয়ী দিন উদ্দেশ্য; পারিভাষিক দিন নয়। শরয়ী দিন হলো সুবহে সাদেক থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। আর পারিভাষিক দিন হলো সূর্য উদিত হওয়া থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত।
আর মধ্যাহ্ন সময় পারিভাষিক দিনের অর্ধেক হয়; শরয়ী দিনের অর্ধেক হয় না। কেননা শরয়ী দিনের অর্ধেক চান্তের শেষ সময় পর্যন্ত হয়। যেমন- আজ ৮ জানুয়ারী ফজরের ওয়াক্ত হয়েছে ৫.৪৮ মিনিটে। সূর্য অস্ত যাবে ৫.৩৬ মিনিটে। এই হিসেবে অর্ধ দিন হয় ১১.৪২ মি.। জামে সগীরের বর্ণনা মতে ১১.৪২ মিনিট যেটা চান্তের শেষ সময় যাকে বৃহৎ পূর্বাহ্ন (ضَحوَةُ الْكُبْرَى) বলা হয়, এর পূর্বেই নিয়ত করা জরুরি। যাতে শরয়ী দিনের অধিকাংশের মধ্যে নিয়ত পাওয়া যায়। এমনিভাবে আজ ৮ জানুয়ারি ২০০৪ ইং সূর্য উদয় হবে ৭.১৭ মিনিটে। আর সূর্য অস্ত যাবে ৫.৩৬ মিনিটে। এর অর্ধেক হবে ১২.২৫ মি. ৩০. সেকেন্ডে। কুদূরীর বর্ণনা অনুযায়ী ১২.২৫ মিঃ যাকে মধ্যাহ্নের ওয়াক্ত বলা হয়, এর পূর্বে নিয়ত করা জরুরি। হিদায়া গ্রন্থকার (র.) জামে সগীরের মতনকে এই কারণে বিশুদ্ধ বলেছেন যে, রোজার মধ্যে শরয়ী দিনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আর শরয়ী দিনের অর্ধেক মধ্যাহ্নের প্রকৃত সময় হয় না; বরং মধ্যাহ্নের সময়ের পূর্বের আনুমানিক এক ঘণ্টা পূর্বেই হয়ে যায়। হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, রমজান এবং নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজার অর্ধ দিনের পূর্বে নিয়ত গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে মুসাফির ও মুকীম উভয়ের ক্ষেত্রে বরাবর। কেননা যে দলিল বর্ণনা করা হয়েছে তার মধ্যে কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে ইমাম জুফার (র.)-এর মতে, মুসাফিরের জন্য রাত্রে নিয়ত করা শর্ত। ভোরের পর অর্ধ দিনের পূর্বে নিয়ত করা গ্রহণযোগ্য হবে না।
وهذا الضرب من الصوم يتأدى بمطلق النية وبنية النفل وبنية واجب آخر وقال الشافعي رحمه الله في نية النفل عابث وفي مطلقها له قولان لأنه بنية النفل معوض عن الفرض فلا يكون له الفرض. ولنا أن الفرض متعين فيه فيصاب بأصل النية كالمتوحد في الدار يصاب باسم جنسه وإذا نوى النفل أو واجبا آخر فقد نوى أصل الصوم وزيادة جهة وقد لغت الجهة فبقي الأصل وهو كاف ولا فرق بين المسافر والمقيم والصحيح والسقيم عند أبي يوسف ومحمد رحمهما الله لأن الرخصة كي لا تلزم المعذور مشقة فإذا تحملها التحق بغير المعذور وعند أبي حنيفة رحمه الله إذا صام المريض والمسافر بنية واجب آخر يقع عنه لأنه شغل الوقت بالأهم لتحتمه للحال وتخيره في صوم رمضان إلى إدراك العدة وعنه في نية التطوع روايتان والفرق على إحداهما أنه ما صرف الوقت إلى الأهم.
অনুবাদ: এই প্রকারের রোজা সাধারণ নিয়ত, নফলের নিয়ত এবং অন্য ওয়াজিবের নিয়ত দ্বারা আদায় হয়। ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, নফলের নিয়ত করলে তা নিরর্থক হবে (ফরজও হবে না নফলও হবে না।। সাধারণ নিয়ত সম্পর্কে তাঁর দুটি মত রয়েছে। কেননা নফলের নিয়ত দ্বারা সে ফরজ রোজার উপেক্ষাকারী হলো। সুতরাং তার জন্য ফরজ আদায় হবে না। আমাদের দলিল হলো, সে দিনটিতে ফরজ নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং মূল নিয়ত দ্বারাই তা হাসিল হয়ে যাবে। যেমন- ঘরে একা বিদ্যমান ব্যক্তিকে তার জাতিবাচক নামে ডাকলেও উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যায়। আর যদি নফল কিংবা অন্য ওয়াজিব রোজার নিয়ত করে থাকে, তাহলেও সে মূল রোজা এবং অন্য একটি অতিরিক্ত দিকের নিয়ত করল। সুতরাং যখন অতিরিক্ত দিকটি বাতিল হয়ে গেল তখন মূল বিষয় [রোজা] অবশিষ্ট থাকল। আর তা-ই ফরজ রোজা আদায়ের জন্য যথেষ্ট। ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (র.)-এর মতে মুসাফির ও মুকীম এবং সুস্থ ও অসুস্থ ব্যক্তির মাঝে এ ব্যাপারে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা [রোজা না রাখার অবকাশ দানের কারণ, 'মাযূর' ব্যক্তির যেন কষ্ট না হয়। কিন্তু যখন সে স্বেচ্ছায় কষ্ট গ্রহণ করে নিল, তখন সে অ-মাযূর ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। ইমাম আবু হানীফা (র.)-এর মতে, অসুস্থ ও মুসাফির ব্যক্তি যখন অন্য ওয়াজিব রোজার নিয়তে রোজা রাখে তখন সে রোজাই সাব্যস্ত হবে। কারণ সময়কে সে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়োজিত করেছে। কেননা, অন্য ওয়াজিবের কাজা এই মুহূর্তে জরুরি। পক্ষান্তরে রমজানের রোজার ব্যাপারে পরবর্তীতে সময় লাভ করা পর্যন্ত সে এখতিয়ারপ্রাপ্ত। নফলের নিয়ত করার ব্যাপারে তাঁর পক্ষ থেকে দুটি মত বর্ণিত হয়েছে। এক বর্ণনা [অর্থাৎ ফরজ হিসেবে গণ্য হওয়ার মতে পার্থক্যের কারণ এই যে, এখানে সময়টিকে সে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিযুক্ত করেনি।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
মাসআলা হলো, রোজার এই প্রকার অর্থাৎ (وَاجِبْ مُعَيِّن )নির্দিষ্ট ওয়াজিব) সাধারণ (مطلق) নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। নফলের নিয়ত এবং অন্য ওয়াজিবের নিয়ত দ্বারাও আদায় হয়ে যায়। কুদূরী গ্রন্থকারের ইবারতের মধ্যে কিছুটা তাছামুহ রয়েছে। তা হলো- وَاجِبْ مُعَيَّن -এর মধ্যে রমজানের রোজা এবং নির্ধারিত দিনের মান্নতের রোজা উভয়টি শামিল আছে।
এখন এর উদ্দেশ্য দাঁড়ায়, যেমনিভাবে রমজানের রোজা সাধারণ নিয়ত, নফল নিয়ত এবং অন্য ওয়াজিবের নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়, তেমনিভাবে نَذْرِ مُعَيَّنْ-এর রোজাও উপরিউক্ত তিনটির দ্বারা আদায় হয়ে যাবে অথচ ব্যাপারটি এমন নয়। কেননা نَذْرِ مُعَيَّنْ -এর রোজা সাধারণ নিয়ত এবং নফলের নিয়ত দ্বারা তো আদায় হয়ে যায়, কিন্তু অন্য ওয়াজিব যেমন- কাজা কিংবা কাফফারার নিয়ত দ্বারা আদায় হয় না; বরং নির্ধারিত মান্নতের দিন যদি রাত্রেই অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করে তবে অন্য ওয়াজিবের রোজা আদায় হবে; মান্নতের রোজা আদায় হবে না। মোদ্দা কথা, হানাফীগণের মাজহাব হলো, রমজানের রোজা সাধারণ নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। যেমন এভাবে বলল, আমি আগামীকাল রোজা রাখব। নফল নিয়ত দ্বারাও আদায় হয়ে যায়। যেমন এভাবে বলল, আমি আগামীকাল নফল রোজা রাখব। অন্য ওয়াজিবের দ্বারাও আদায় হয়ে যায়। যেমন এভাবে বলল, আমি আগামীকাল কাফফারা কিংবা বিগত বছরের রমজানের কাজা রোজা রাখব।
ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, রমজানের রোজার মধ্যে যদি নফলের নিয়ত করে তবে রমজানের রোজাও আদায় হবে না এবং নফল রোজাও আদায় হবে না; বরং ঐ দিন বিরত থাকা নিরর্থক হবে। কেননা, রমজানের রোজার তো নিয়ত করেনি। আর নফল রোজার কোনো [নির্ধারিত] সময় বা দিন নেই। তাই এটি কোনো রোজাই হবে না। আর যদি রমজানের মধ্যে সাধারণ রোজার নিয়ত করে তবে এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দুটি অভিমত রয়েছে। একটি হলো, সাধারণ নিয়ত দ্বারা রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। দ্বিতীয়টি হলো, রমজানের রোজা আদায় হবে না। এটাই ইমাম মালিক ও আহমদ (র.)-এর অভিমত।
নফলের নিয়ত দ্বারা রমজানের রোজা আদায় হবে না- এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিল হলো, রমজানের সাথে নফল রোজার নিয়ত করে সে যেন ফরজকেই উপেক্ষা করল। কেননা ফরজ ও নফলের মাঝে বিরোধ রয়েছে। সুতরাং ফরজকে উপেক্ষা করা এমন যেমন সে নিয়তই বর্জন করেছে। আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, নিয়ত বর্জন দ্বারা রোজা আদায় হবে না। এজন্য ঐ সুরতে রমজানের রোজা আদায় হবে না। আর যেহেতু নফল রোজার কোনো সময় নেই এজন্য নফল রোজাও আদায় হবে না।
সাধারণ নিয়তের সুরতে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর প্রথম অভিমতের দলিল হলো, যখন রমজান মাসে সাধারণ রোজার নিয়ত পাওয়া গিয়েছে তখন এই ব্যক্তি ঐ নিয়ত দ্বারা ফরজকে উপেক্ষাকারী হবে না। আর যখন ফরজ থেকে বিমুখতা পাওয়া গেল না তখন রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। দ্বিতীয় অভিমতের দলিল হলো- যেমনিভাবে মূল রোজা ইবাদত, তেমনিভাবে وَصْفَ فَرْضِيَّتْ -ও ইবাদত। মূল রোজা নিয়ত ব্যতীত আদায় হয় না। সুতরাং যেমনিভাবে মূল রোজা নিয়ত ছাড়া আদায় হয় না তেমনিভাবে وصف فَرْضِيْت -ও নিয়ত ছাড়া আদায় হবে না। আর সাধারণ নিয়তের সুরতে যেহেতু وَصَفُ فَرْضِيَّت অস্তিত্বহীন হয়ে গেল, এজন্য মূল রোজাও অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।
আমাদের দলিল হলো, রমজানের মাস ফরজ রোজার জন্য নির্ধারিত। তাইতো রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন- إِذَا أَنْسَلَخ شعَبَانٌ فَلَا صَوْمَ إِلَّا رَمَضَانُ "যখন শাবান মাস শেষ হয়ে গেল, তখন রমজান ব্যতীত কোনো রোজা নেই।” অর্থাৎ ঐ মাসের মধ্যে রমজানের ফরজ রোজা ব্যতীত আর কোনো রোজা নেই। সুতরাং যখন রমজানের মাস ফরজ রোজার জন্য নির্ধারিত তখন রোজার ফরজিয়ত মূল নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যাবে। যেমন- কোনো ঘরে একা এক ব্যক্তি বিদ্যমান আছে। তাকে তার জাতিবাচক নামে ডাকলেও সে ব্যক্তিই উদ্দেশ্য হবে এবং এ ধরনের ডাকাও সঠিক হবে- যেমন বলল, ওহে প্রাণী! সুতরাং ওহে প্রাণী দ্বারা সে ব্যক্তিই উদ্দেশ্য হবে যে ব্যক্তি ঘরে বিদ্যমান আছে। যেমন, ওহে ইনসান এবং তার নাম হে যায়েদ দ্বারা সে-ই উদ্দেশ্য হবে। এমনিভাবে রমজানের মাস যখন ফরজ রোজার জন্য নির্ধারিত তখন শুধু রোজার নিয়ত দ্বারা ঐ রোজাই আদায় হবে যার স্থান এই মাস। আর যখন সে নফল কিংবা অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করল, তখন সে যেন মূল রোজার নিয়ত করল এবং একটি অতিরিক্ত জিনিস তথা নফল কিংবা ওয়াজিবের নিয়ত করল। সুতরাং এই অতিরিক্ত বস্তুটি বাতিল হয়ে যাবে। কেননা, সময় তথা রমজান মাস তাকে গ্রহণ করে না। আর যখন অতিরিক্ত দিকটি বাতিল হয়ে গেল তখন আসল রোজার নিয়ত অবশিষ্ট থাকল। আর পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূল নিয়ত দ্বারা রমজানের সমান রোজা আদায় হয়ে যায়। এ জন্য নফল কিংবা অন্য ওয়াজিবের নিয়ত দ্বারাও রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে।
সাহেবাইন (র.) বলেন, রমজানের রোজা সাধারণ নিয়ত, নফলের নিয়ত এবং অন্য ওয়াজিব নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। উক্ত হুকুমের মধ্যে মুসাফির, মুকীম, সুস্থ, অসুস্থ সকলেই সমান। কেননা মুসাফির ও রোগীকে রমজানের রোজা বিলম্ব করার অবকাশ এজন্য দেওয়া হয়েছিল যে, যাতে তাদের সফরের ওজর আর রোগের ওজরের কারণে রোজার কষ্ট অনুভব না হয়। কিন্তু যখন তারা স্বেচ্ছায় কষ্টকে গ্রহণ করে নিল তখন তারা সুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। আর সুস্থ ব্যক্তির ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের রমজানের রোজা সাধারণ নিয়ত, নফল নিয়ত এবং অন্য ওয়াজিবের নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। তাই মুসাফির ও রুগীর রমজানের রোজাও উপরিউক্ত সব ধরনের নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যাবে। ইমাম আবু হানীফা (র.) বলেন, যদি মুসাফির ও রোগী ব্যক্তি রমজানের মধ্যে অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করত রোজা রাখে তবে অন্য ওয়াজিবের রোজাই আদায় হবে; রমজানের রোজা আদায় হবে না। দলিল এই যে, অন্য ওয়াজিব তথা কাজা কিংবা কাফফারার রোজা তো তার উপর তাৎক্ষণিকভাবে অপরিহার্য। সুতরাং এই অবস্থায় যদি সে মৃত্যুবরণ করে তখন ঐ অন্য ওয়াজিবের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট পাকড়াও হবে।
রমজানের রোজাকে অসুস্থ ও সফরের কারণে বিলম্ব করার এখতিয়ার [অধিকার] দেওয়া হয়েছে। অতএব এই ব্যক্তি যদি ঐ রোগ কিংবা ঐ সফরে মারা যায় তবে এই রমজানের ব্যাপারে পাকড়াও হবে না। সুতরাং বুঝা গেল, অসুস্থ ও মুসাফিরের ক্ষেত্রে অন্য ওয়াজিবটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর রমজানের রোজা হলো গুরুত্বহীন। আর নিয়ম হলো, সময়কে গুরুত্বের সাথে নিয়োজিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে গুরুত্বহীন বিষয়ের অগ্রে আদায় করা। এজন্য ইমাম সাহেব (র.) বলেছেন, রমজানের মধ্যে যদি মুসাফির ও রুগী ব্যক্তি অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করে তবে ঐ অন্য ওয়াজিবটি আদায় হবে। রমজানের রোজা আদায় হবে না।
যদি মুসাফির রমজানের মাঝে নফল রোজার নিয়ত করে তবে এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (র.) থেকে দুটি অভিমত বর্ণিত হয়েছে-
১. ঐ সুরতে রমজানের রোজা আদায় হবে; নফল রোজা আদায় হবে না।
২. নফল রোজা আদায় হবে; রমজানের রোজা আদায় হবে না। প্রথম মতের দলিল এই যে, মুসাফির ব্যক্তি রমজানে নফল রোজার নিয়ত করে সময়কে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়োজিত করেনি; বরং উদ্দেশ্য হলো সওয়াব হাসিল করা। আর সওয়াব নফলের তুলনায় রমজানের রোজায় অধিক। এজন্য নফল রোজার নিয়ত করা সত্ত্বেও রমজানের রোজাই আদায় হবে। দ্বিতীয় মতের দলিল হলো, মুসাফিরের ক্ষেত্রে রমজানের রোজা এমন যেমন মুকীমের ক্ষেত্রে শাবানের রোজা। শাবান মাসে নফল কিংবা অন্য ওয়াজিব যার নিয়ত করা হবে সেটিই আদায় হবে। সুতরাং এমনিভাবে মুসাফির রমজান মাসে যার নিয়ত করবে নফল কিংবা অন্য ওয়াজিবের, তা-ই আদায় হবে।
قال: " والضرب الثاني ما ثبت في الذمة كقضاء شهر رمضان والنذر المطلق وصوم الكفارة فلا يجوز إلا بنية من الليل " لأنه غير متعين ولا بد من التعيين من الابتداء " والنفل كله يجوز بنية قبل الزوال " خلافا لمالك رحمه الله فإنه يتمسك بإطلاق ما روينا.
ولنا قوله صلى الله عليه وسلم بعد ما كان يصبح غير صائم " إني إذا لصائم " ولأن المشروع خارج رمضان هو النفل فيتوقف الإمساك في أول اليوم على صيرورته صوما بالنية على ما ذكرنا ولو نوى بعد الزوال لا يجوز وقال الشافعي رحمه الله يجوز ويصير صائما من حين نوى إذ هو متجزئ عنده لكونه مبنيا على النشاط ولعله ينشط بعد الزوال إلا أن من شرطه الإمساك في أول النهار وعندنا يصير صائما من أول النهار لأنه عبادة قهر النفس وهي إنما تتحقق بإمساك مقدر فيعتبر قران النية بأكثره.
অনুবাদ: দ্বিতীয় প্রকার হলো এমন রোজা, যা [অনির্ধারিতভাবে) তার জিম্মায় ওয়াজিব। যেমন- রমজান মাসের কাজা রোজা এবং কাফফারার রোজা। সুতরাং রাত্রেকৃত নিয়ত ছাড়া তা জায়েজ হবে না। কেননা তা নির্ধারিত নয়। অথচ প্রথম থেকে নির্ধারণ করা জরুরি। সকল নফল রোজা মধ্যাহ্নের পূর্বে নিয়ত করা দ্বারা জায়েজ। ইমাম মালিক (র.) ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি আমাদের উল্লিখিত হাদীসের ব্যাপকতা প্রমাণরূপে গ্রহণ করেন। আমাদের দলিল এই যে, রাসূলুল্লাহ বে-রোজাদার অবস্থায় ভোর হওয়ার পরে বলেছেন- إِذَا لَصَائِمُ "এখন থেকে আমি রোজা রেখে দিলাম।" তা ছাড়া যৌক্তিক কারণ এই যে, রমজানের বাইরে নফল রোজা শরিয়ত অনুমোদিত ইবাদত। সুভরাং দিনের প্রথমাংশের পানাহার সংযমটি রোজারূপে গৃহীত হওয়া নিয়তের উপর নির্ভর করবে। যেমন আমরা আগে উল্লেখ করে এসেছি। যদি মধ্যাহ্নের পরে নিয়ভ করে তবে জায়েজ হবে না। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, জায়েজ হবে। আর যখন নিয়ত করবে তখন থেকে সে রোজাদার বিবেচিত হবে। কেননা, তার মতে রোজা বিভাজন গ্রহণ করে। কারণ নফলের ভিত্তি হচ্ছে মনের প্রফুল্লতার উপর। এমনও হতে পারে যে, মধ্যাহ্নের পর সে প্রফুল্লতা অনুভব করল। তবে তার জন্য শর্ত হলো, দিনের শুরু থেকেই পানাহার থেকে বিরত থাকা। আমাদের মতে দিনের শুরু থেকেই সে রোজাদার বলে গণ্য হবে। কেননা, এটা হলো আত্মদমনের বিশেষ ইবাদত। আর তা নির্ধারিত সময়ে রোজা বিরুদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা দ্বারা সংঘটিত হয়। সুতরাং দিনের অধিকাংশ সময়ের সঙ্গে নিয়ত যুক্ত হওয়া বিবেচ্য হবে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
রোজার দ্বিতীয় প্রকার হলো, যা তার জিম্মায় ওয়াজিব এবং এর জন্য নির্ধারিত কোনো দিন-ক্ষণ নেই। যেমন- রমজানের কাজা রোজা, কাফফারায়ে ইয়ামীনের রোজা, কাফফারায়ে জিহারের রোজা, কাফফারায়ে কতলের [হত্যার রোজা, জাযায়ে সাইদের [শিকারের) রোজা, নজরে মুতলকের রোজা। এ সকল রোজার হুকুম হলো, রাত্রে কিংবা ভোর হওয়ার সাথে সাথেই যদি নিয়ত করা হয় তবে জায়েজ। আর যদি ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পর নিয়ত করে তবে রোজা জায়েজ হবে না। কেননা এ ধরনের রোজার নির্ধারিত কোনো সময় নেই; বরং সারা বছরে রমজান এবং নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া যে-কোনো সময় রাখতে পারে। এ জন্য দিনের শুরুতেই নির্ধারণ করা জরুরি। আর দিন শুরু হয় ফজর উদিত হওয়া থেকে। এজন্য ফজরের ওয়াক্তের পূর্বে নিয়ত করবে কিংবা ফজরের ওয়াক্তের সাথে সাথেই নিয়ত করবে।
নফল রোজার জন্য অর্ধ দিনের পূর্বেই নিয়ত করা জরুরি। তাই শরয়ী দিনের অর্ধেকাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর যদি নিয়ত করা হয় তবে রোজা গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম মালিক (র.) বলেন, নফল রোজার জন্যও রাত্রে নিয়ত করা জরুরি। ফজরের ওয়াক্তের পর যদি নিয়ত করা হয়, তবে নফল রোজাও গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁর দলিল এই যে-
لَا صِيَامَ لِمَنْ لَمْ يَنْرِ الصِّيَامَ مِنَ اللَّيْلِ .
যে ব্যক্তি আগের রাত থেকে রোজা রাখার নিয়ত করে না, তার রোজা নেই।
উপরিউক্ত হাদীসটি মুতলক। এর মধ্যে ফরজ রোজা ও নফল রোজার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এজন্য সব ধরনের রোজার ক্ষেত্রেই রাত্রে নিয়ত করা একান্ত আবশ্যক।
আমাদের দলিল হলো আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীস-
إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَدْخُلُ عَلَى نِسَائِهِ وَيَقُولُ هَلْ عِنْدَكُنَّ مِنْ عَذَاءٍ فَإِنْ قُلْنَ لَا قَالَ إِنِّي إِذًا لَصَائِمُ
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের কাছে যেতেন এবং বলতেন, “তোমাদের কাছে কি খাবার আছে?” যদি তারা বলতেন, “না,” তাহলে তিনি বলতেন, “তাহলে আমি রোজা রাখছি।”
অর্থ- রাসূলুল্লাহ তাঁর বিবিদের গৃহে তাশরীফ নিয়ে যেতেন আর বলতেন, তোমাদের নিকট খাওয়ার কিছু আছে কি? যদি তাঁরা বলতেন কিছু নেই, তখন তিনি বলতেন, আমি এখন থেকে রোজাদার।
অর্থাৎ ভোর হওয়ার পর যখন তিনি খাওয়ার কোনো জিনিস না পেতেন তখন তিনি রোজার নিয়ত করে নিতেন। এর দ্বারা বুঝা গেল নফল রোজার নিয়ত সূর্য উদিত হওয়ার পরও করা জায়েজ।
আর আকলী দলিল হলো, রমজানের রোজা ব্যতীত পুরো সময় নফল রোজার জন্য অনুমোদিত। সুতরাং দিনের প্রথমাংশে ইমসাক তথা পানাহার এবং সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা হওয়া নিয়তের উপর নির্ভরশীল হবে, তবে শর্ত হলো, নিয়ত দিনের অধিকাংশে পাওয়া যেতে হবে। আর নিয়ত দিনের অধিকাংশে তখনই পাওয়াগেছে বলা হবে যখন তা দিনের অর্ধেকের পূর্বে করা হবে।
আর নফলের নিয়ত যদি মধ্যাহ্নের পর করা হয় তবে আমাদের মতে জায়েজ হবে না। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে জায়েজ। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে রোজাদার হিসেবে তখন গণ্য হবে যখন থেকে সে রোজার নিয়ত করেছে। কেননা তাঁর মতে রোজা বিভাজন গ্রহণ করে। তাঁর দলিল এই যে, সকল কাজের ভিত্তি হচ্ছে মনের প্রফুল্লতার উপর। আর এমনও হতে পারে যে, তার মনে মধ্যাহ্নের পরেই প্রফুল্লতা অনুভব হয়। সুতরাং যখন জাওয়ালের পর প্রফুল্লতা আসল তখনই নিয়ত করে রোজা আরম্ভ করে দিল। সেক্ষেত্রে এই রোজা ঐ সময়ের নিয়ত দ্বারা গণ্য হবে। তবে তার শর্ত এই যে, দিনের শুরু থেকেই পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। যেমন- কেউ ফজরের ওয়াক্ত থেকে মধ্যাহ্নের পর পর্যন্ত কিছু পানাহার করেনি। অতঃপর মধ্যাহ্নের পর আনুমানিক দুই ঘটিকা হতে রোজার নিয়ত করল। তাহলে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে দুই ঘটিকা থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত তার নফল রোজা গ্রহণযোগ্য হবে।
আর যদি ফজরের পর কিছু পানাহার করে নফল রোজার নিয়ত করে তবে এই রোজা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর আমাদের মতে, রোজা যেহেতু বিভাজনযোগ্য নয় সেহেতু রোজার গ্রহণযোগ্যতা দিনের শুরু থেকেই হবে। কারণ, রোজা হলো আত্মদমনের এক বিশেষ ইবাদত। আর এই ইবাদত একটি নির্ধারিত সময় বিরত থাকা দ্বারা সংঘটিত হয়। ঐ বিরত থাকার পরিমাণ হলো পূর্ণ একদিন। অর্থাৎ সূর্য উদিত হওয়া থেকে অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। সুতরাং দিনের অধিকাংশ সময়ের সাথে নিয়ত যুক্ত হওয়া জরুরি। অর্থাৎ যদি দিনের অধিকাংশে নিয়ত পাওয়া যায় তবে রোজা গ্রহণযোগ্য হবে, নতুবা নয়।
قال: " وينبغي للناس أن يلتمسوا الهلال في اليوم التاسع والعشرين من شعبان فإن رأوه صاموا وإن غم عليهم أكملوا عدة شعبان ثلاثين يوما ثم صاموا " لقوله صلى الله عليه وسلم " صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته فإن غم عليكم الهلال فأكملوا عدة شعبان ثلاثين يوما" ولأن الأصل بقاء الشهر فلا ينتقل عنه إلا بدليل ولم يوجد " ولا يصومون يوم الشك إلا تطوعا " لقوله صلى الله عليه وسلم " لا يصام اليوم الذي يشك فيه أنه من رمضان إلا تطوعا " وهذه المسئلة على وجوه:
أحدها: أن ينوي صوم رمضان وهو مكروه لما روينا ولأنه تشبه بأهل الكتاب لأنهم زادوا في مدة صومهم ثم إن ظهر أن اليوم من رمضان يجزئه لأنه شهد الشهر وصامه وإن ظهر أنه من شعبان كان تطوعا وإن أفطر لم يقضه لأنه في معنى المظنون.
অনুবাদ: ইমাম কুদূরী (র.) বলেন, মানুষের কর্তব্য হলো শাবান মাসের ঊনত্রিশ তারিখে চাঁদ অনুসন্ধান করা। যদি তারা চাঁদ দেখতে পায়, তাহলে রোজা রাখবে। আর যদি [মেঘের কারণে) চাঁদ তাদের অগোচরে থাকে তাহলে শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে। অতঃপর রোজা রাখবে। কেননা রাসূলুল্লাহ বলেছেন- صُومُوا لِرَزْيَتِهِ وَأَفطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمُ الْهَلَالُ فَاكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ تَلْثِيْنَ يَوْمًا তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। আর যদি চাঁদ তোমাদের অগোচরে থাকে তাহলে শাবান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো।" তা ছাড়া এই কারণে যে, প্রকৃত অবস্থা হলো মাস অব্যাহত থাকা। সুতরাং প্রমাণ ছাড়া উক্ত মাস থেকে বের হওয়া যাবে না। আর এখানে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। [ত্রিশ তারিখের] সন্দেহপূর্ণ দিনটিতে নফল ছাড়া অন্য কোনো রোজা রাখবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ বলেছেন- لَا يُصَامُ الْيَوْمُ الَّذِي يُشَكُّ فِيْهِ أَنَّهُ مِنْ رَمَضَانَ إِلَّا تَطَوُّعًا দিনটি সম্পর্কে সন্দেহ হয় যে, তা রমজান কিনা, সে দিনে নফল ছাড়া অন্য কোনো রোজা রাখা যাবে না। এই মাসআলাটি কয়েক প্রকার- প্রথম প্রকার হলো, রমজানের নিয়ত করে রোজা রাখা মাকরূহ। দলিল হলো, আমাদের উপরে বর্ণিত হাদীস। আরো এ কারণে যে, এতে আহলে কিতাবের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়। কেননা তারা তাদের রোজার পরিমাণে বর্ধিত করেছিল। তবে রোজা রাখার পর যদি দেখা যায় যে, দিনটি রমজানেরই দিন, তাহলে তা রমজানের রোজা হিসেবে যথেষ্ট হবে। কেননা সে মাস পেয়েছে এবং তাতে রোজা রেখেছে। আর যদি প্রকাশ পায় যে, দিনটি শাবান মাসের ছিল, তাহলে তা নফল হয়ে যাবে। আর যদি রোজা ভঙ্গ করে, তাহলে তার কাজা করবে না। কেননা তা ধারণা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
আল্লামা ইবনুল হুমাম (র.) 'ফতহুল কাদীর' গ্রন্থে লিখেছেন যে, শাবানের উনত্রিশ তারিখে রমজানের চাঁদ দেখা ওয়াজিবে কিফায়াহ। কেননা, মাস কখনো উনত্রিশ দিনে হয় আবার কখনো ত্রিশ দিনে হয়। সুতরাং শাবানের উনত্রিশ তারিখে যদি চাঁদ দেখা যায় তবে রোজা রাখবে। আর যদি চাঁদ না দেখা যায় তবে শাবানের ত্রিশ তারিখ পূর্ণ করবে এবং পরের দিন রোজা রাখবে। দলিল, রাসূলুল্লাহ-এর বাণী-
صُومُوا لِرَزْيَتِهِ وَأَفطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمُ الْهَلَالُ فَاكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ تَلْثِيْنَ يَوْمًا
যখন তোমরা তা দেখবে তখন রোজা রাখবে এবং যখন তোমরা তা দেখবে তখন রোজা ভাঙবে। যদি তোমাদের সামনে অর্ধচন্দ্র দেখা দেয়, তাহলে শা'বানের ত্রিশ দিন গণনা পূর্ণ করবে।
আকলী দলিল হলো, প্রকৃত অবস্থা শাবান মাস অব্যাহত থাকা। কেননা শাবান মাস অতীত থেকে অবশ্যভাবীরূপে চলে আসছে। তাই প্রমাণ ছাড়া উক্ত মাস থেকে রমজানের মাসের দিকে বের হওয়া যাবে না। আর এখানে কোনো দলিল- প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অতএব বুঝা গেল, ২৯ তারিখে অবশ্যই চাঁদ দেখা যায়নি; বরং মেঘ ইত্যাদির কারণে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। আর সন্দেহের কারণে একিন দূরীভূত হয় না। সুতরাং ২৯ তারিখে চাঁদের সন্দেহের কারণে শাবান মাস শেষ হয়নি; বরং ত্রিশ তারিখ পর্যন্ত শাবান মাস অব্যাহত থাকবে।
يَوْمُ الشَّكِّ : قَوْلُهُ وَلَا يَصُومُونَ العَ ইয়াওমুশ শাক। দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শাবানের শেষ দিন, যার ব্যাপারে এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, তা রমজানের প্রথম দিন এবং এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, শাবানের শেষ দিন অর্থাৎ শাবানের ত্রিশ তারিখ। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, শাবানের শেষ দিন অর্থাৎ শাবানের ত্রিশ তারিখ সন্দেহপূর্ণ দিন (يَوْمُ الشَّكِ) তখন হবে যখন শাবানের ঊনত্রিশ তারিখে উদয়াচল (مَطْلَعْ) পরিষ্কার না থাকার কারণে চাঁদ উদয় হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হয়েছিল। যদি উদয়াচল পরিষ্কার হয় তবে পরের দিনকে সন্দেহপূর্ণ দিন বলা যাবে না। মোদ্দা কথা সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজা ব্যতীত অন্য কোনো রোজা রাখা যাবে না। দলিল হলো এই হাদীস- لَا يُصَامُ الْيَوْمُ الَّذِي يُشَكٍّ فِيْهِ أَنَّهُ مِنْ رَمَضَانَ হিদায়া গ্রন্থকার উপরিউক্ত মাসআলার পাঁচটি সুরত বর্ণনা করেছেন- প্রথম প্রকার হলো কেউ সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের রোজার নিয়ত করল। এটি মাকরূহ। দলিল হলো উপরে বর্ণিত হাদীস। তবে এর উপর একটি প্রশ্ন হয়। তা-হলো, হাদীসের মধ্যে (لَا يُصَامُ) - نَفِي এর সীগাহ। আর نَفِي নাজায়েজকে বুঝায়। তাই এর দ্বারা সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের রোজার নিয়তে রোজা রাখা নাজায়েজ প্রমাণিত হয়; মাকরূহ নয়।
জওয়াব: হাদীসের মধ্যে نَفِي টি نهی -এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর মর্ম দ্বারা অনুমোদন বুঝা যায়। সুতরাং বুঝা গেল, সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজার নিয়তে রোজা রাখার মৌলিভাবে অনুমোদন তো রয়েছে তবে نَفِي -এর কারণে الْمَمنُوع وَلِغَيْرِه -এর الْمَمنُوعُ لِغَيْرِه এর অপর নাম হলো মাকরূহ। এ কারণে বলা হয়েছে যে, ঐ দিনে রমজানের নিয়তে রোজা রাখা জায়েজ তো বটে তবে মাকরূহ।
আকলী দলিল এই যে, সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজার নিয়তে রোজা রাখার মধ্যে ইহুদি ও নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। কেননা, তারা তাদের রোজার পরিমাণের মধ্যে বর্ধিত করতো। তার কারণ ছিল, যদি কখনো রোজা গরমের মৌসুমে হতো তখন তাদের আলিমগণ তা শীতের মৌসুমে করে দিতো। উক্ত পরিবর্তনের কারণে কিছু রোজা বৃদ্ধি হয়ে যেতো। সুতরাং যেহেতু সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের রোজা রাখার মধ্যে উপরিউক্ত সাদৃশ্য রয়েছে, তাই ঐ দিনে রমজানের রোজার নিয়তে রোজা রাখাকে মাকরূহ বলা হয়েছে। মোট কথা, সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের নিয়তে রোজা রাখা মাকরূহ। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও কেউ যদি রোজা রাখে এবং পরে জানা যায় যে, এটি প্রকৃতপক্ষে রমজানেরও দিন ছিল, তবে তার এই রোজা রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হবে। তার উপর ঐ দিনের রোজার কাজা করতে হবে না। কেননা এ ব্যক্তি রমজানের মাস পেয়েছে এবং তাতে রোজা রেখেছে। তাই সে আল্লাহ তা'আলার বাণী- فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ -এর উপর আমলকারী হয়ে গেল।
আর যদি পরে জানা যায় যে, এটি শাবানের দিন ছিল, তাহলে তা নফল রোজা হয়ে যাবে এবং মাকরূহের সাথে জায়েজ হবে। আর যদি সে রোজা ভঙ্গ করে এবং প্রমাণিত হয় যে, এটি শাবানের দিন তবে তার উপর তা কাজা করা অপরিহার্য হবে না। কেননা এই ব্যক্তি ধারণা পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সে এই ধারণার সাথে রোজা আরম্ভ করেছে যে, তা আমার উপর ওয়াজিব। অথচ তা ওয়াজিব ছিল না। আর ধারণায় নিপতিত লোকের উপর কাজা ওয়াজিব হবে না। যেমন- এক ব্যক্তি জোহরের নামাজ পড়ল পরে তা তার স্মরণ নেই বিধায় সে দ্বিতীয়বার জোহরের ফরজ নামাজ আরম্ভ করে দিল। তারপর স্মরণ হলো যে, জোহরতো পড়েছে। এখন সে যদি জোহরের নামাজ পূর্ণ করে তবে তা নফল হয়ে যাবে। আর যদি মাঝখানে ভঙ্গ করে দেয় তবে উক্ত নফলের কাজা ওয়াজিব হবে না। সুতরাং এমনিভাবে যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের নিয়তে রোজা রাখল এবং পরে জানা গেল যে, আজকে রমজান শুরু হয়নি। এখন সে যদি এই রোজা পূর্ণ করে তবে নফল হয়ে যাবে আর যদি মাঝখানে রোজা ভঙ্গ করে তবে তার কাজা ওয়াজিব হবে না।
والثاني: أن ينوي عن واجب آخر وهو مكروه أيضا لما روينا إلا أن هذا دون الأول في الكراهة ثم إن ظهر أنه من رمضان يجزئه لوجود أصل النية وإن ظهر أنه من شعبان فقد قيل يكون تطوعا لأنه منهي عنه فلا يتأدى به الواجب وقيل يجزئه عن الذين نراه وهو الأصح لأن المنهي عنه وهو التقدم على رمضان بصوم رمضان لا يقوم بكل صوم بخلاف يوم العيد لأن المنهي عنه وهو ترك الإجابة يلازم كل صوم والكراهية ههنا لصورة النهي.
অনুবাদ: দ্বিতীয় প্রকার এই যে, রমজান ছাড়া অন্য কোনো ওয়াজিব রোজার নিয়ত করল। সেটাও মাকরূহ। দলিল, ইতঃপূর্বে আমাদের বর্ণিত হাদীস। তবে মাকরূহ হওয়ার ক্ষেত্রে এটি প্রথমটির তুলনায় গৌণ। এরপর যদি দেখা যায় যে, দিনটি রমজানের দিন ছিল, তাহলে রমজানের রোজা হিসেবে যথেষ্ট হয়ে যাবে। কেননা, রোজার মূল নিয়ত বিদ্যমান রয়েছে। পক্ষান্তরে যদি প্রকাশ পায় যে, তা শাবানের দিন ছিল, তাহলে কারো কারো মতে তা নফল হবে। কেননা, এ রোজা নিষিদ্ধ ছিল। সুতরাং তা ছাড়া ওয়াজিব রোজা আদায় হবে না। কোনো কোনো মতে, যে রোজার নিয়ত করেছে তা আদায় হয়ে যাবে। এটি বিশুদ্ধতম অভিমত। কেননা যে রোজাকে নিষেধ করা হয়েছে, তা হলো রমজানের উপর রমজানের রোজাকে অগ্রবর্তী করা। সব ধরনের রোজা দ্বারা তা বাস্তবায়িত হবে না। ঈদের দিনের বিষয়টি এর বিপরীত। কেননা এখানে নিষিদ্ধ বিষয়টি অর্থাৎ আল্লাহর দাওয়াত গ্রহণ করাকে বর্জন করা যে কোনো রোজা দ্বারা অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর সেখানে মাকরূহ হওয়া সাব্যস্ত হয়েছে নিষেধ হওয়ার কারণে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
দ্বিতীয় প্রকার হলো, সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো ওয়াজিবের নিয়ত করল। যেমন- বিগত রমজানের কাজা রোজার নিয়ত করল, কিংবা কাফফারার রোজার নিয়ত করল। তবে এটিও মাকরূহের সাথে জায়েজ হবে। দলিল হলো- ঐ হাদীস যা ইতঃপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি لَا يُصَامُ الْيَوْمُ الَّذِي يَشَكٍّ فِيْهِ الْحَدِيثُ | তবে মাকরুহ হওয়ার ক্ষেত্রে এ সুরতটি প্রথম সুরতের তুলনায় গৌণ। কেননা এই সুরতের মধ্যে আহলে কিতাবের সাথে সাদৃশ্য লাযিম আসে না। এখন অন্য ওয়াজিবের নিয়তের সাথে রোজা রাখার পর যদি জানা যায় যে, এটি রমজানের দিন ছিল তবে রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হবে। কেননা অন্য ওয়াজিবের ভিতরে মূল নিয়ত পাওয়া গেছে। আর মূল নিয়ত দ্বারা রমজানের রোজা আদায় হয়ে যায়। এজন্য এই রোজাটি রমজানের রোজা হিসেবেই গণ্য হবে।
আর যদি পরে জানা যায় যে, এই দিনটি শাবানের দিন ছিল। তাহলে কারো কারো মতে, এই রোজাটি অন্য ওয়াজিবের নিয়ত থাকা সত্ত্বেও নফল হবে। কেননা সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ ছিল। এজন্য এই দিনের রোজা অসম্পূর্ণ হবে। আর যে রোজা তার জিম্মায় ওয়াজিব তা হলো পরিপূর্ণ। তাই পরিপূর্ণের আদায় অপরিপূর্ণের দ্বারা হবে না। যেমন- ঈদের দিন যদি অন্য কোনো ওয়াজিবের রোজা রাখা হয় তবে সেই ওয়াজিব রোজা আদায় হবে না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, যে ওয়াজিবের নিয়ত করেছে তা আদায় হয়ে যাবে। এটিই বিশুদ্ধতম অভিমত। কেননা, আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস-
لَا تُتَتَقَدَّمُوا رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ وَلَا بِصَوْمٍ يَوْمَيْنِ
"রমজানের উপর এক এবং দুই দিনের রোজা অগ্রবর্তী করো না"- এর মধ্যে রমজানের রোজা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ রমজানের উপর এক কিংবা দুই রমজানের রোজা মনে করে অগ্রবর্তী করো না। মোট কথা, রমজানের পূর্বে সম্পূর্ণরূপে রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়নি; বরং রমজানের পূর্বে রমজান মনে করে রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। আর যে অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করেছে স্পষ্টত সে তা রমজানের রোজা মনে করে আদায় করেনি। এজন্য অন্য ওয়াজিবের রোজা ঐ দিন নিষিদ্ধ হবে না। আর যেহেতু নিষিদ্ধ নয় তাই ঐ দিন অন্য ওয়াজিবের রোজা রাখা দ্বারা অন্য ওয়াজিবের রোজাই আদায় হবে। এতে কোনো অসুবিধা নেই, তবে ঈদের দিনে রোজা রাখা এই কারণে নিষিদ্ধ যে, ঈদের দিন আল্লাহর সকল বান্দা তাঁর মেহমান হয়। তাই ঐ দিন রোজা রাখা মানে আল্লাহর দাওয়াতকে অস্বীকার করা। আর আল্লাহর দাওয়াত বর্জন করা নিষিদ্ধ। এ কারণেই ঈদের দিন রোজা রাখতে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা দাওয়াত বর্জন করার অর্থ সব ধরনের রোজার মধ্যেই পাওয়া যায়। قَوْلَهُ وَالْكَرَاهَةُ هنَا بِصُورَةِ النَّهْي : এই ইবারতটি দ্বারা একটি প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটি হলো, যখন রমজানের উপর রমজানের রোজা মনে করে অগ্রবর্তী করা নিষিদ্ধ তখন রমজানের পূর্বে অন্য ওয়াজিবের রোজা মাকরূহ ছাড়াই জায়েজ হওয়া উচিত ছিল। অথচ আপনি বলেছেন, মাকরূহের সাথে জায়েজ হবে।
উত্তর : বাহ্যত (نهِی (صُورَة পাওয়া গেছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে- لَيُصامُ الْيَوْمُ الْحَدِيث এজন্য অন্য ওয়াজিবের রোজাকে মাকরুহে তানজীহী বলা হয়েছে।
والثالث: أن ينوي التطوع وهو غير مكروه لما روينا وهو حجة على الشافعي ﵀ في قوله يكره على سبيل الابتداء والمراد بقوله ﷺ "لا تتقدموا رمضان بصوم يوم ولا بصوم يومين" الحديث التقدم بصوم رمضان لأنه يؤديه قبل أوانه ثم إن وافق صوما كان يصومه فالصوم أفضل بالإجماع وكذا إذا صام ثلاثة أيام من آخر الشهر فصاعدا وإن أفرده فقد قيل الفطر أفضل احترازا عن ظاهر النهي وقد قيل الصوم أفضل اقتداء بعلي وعائشة ﵄ فإنهما كانا يصومانه والمختار أن يصوم المفتي بنفسه أخذا بالاحتياط ويفتي العامة بالتلوم إلى وقت الزوال ثم بالإفطار نفيا للتهمة
অনুবাদ: তৃতীয় প্রকার, নফলের নিয়ত করা। এটি মাকরূহ নয়। দলিল, ইতঃপূর্বে আমাদের বর্ণিত হাদীস। আর উক্ত হাদীস ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর বক্তব্য, 'নতুনভাবে রোজা রাখা ঐ দিন মাকরূহ'-এর বিপক্ষে প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ -এর নিম্নোক্ত হাদীস- لَا تُتَتَقَدَّمُوا رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ وَلَا بِصَوْمٍ يَوْمَيْنِ "তোমরা একটি বা দুটি রোজা দ্বারা রমজানের অগ্রগামী হয়ো না"-এর উদ্দেশ্য হলো, রমজানের রোজা রেখে অগ্রবর্তী হওয়া থেকে নিষেধ করা। কেননা এতে সময়ের পূর্বেই রমজানের রোজা রাখা হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যদি ঐ দিনটি এমন কোনো দিন হয় যাতে সে পূর্ব হতেই রোজা রেখে আসছে, তাহলে সকলের ঐকমত্যেই রোজা রাখা উত্তম। তদ্রূপ যদি এমন হয় যে, [শাবান] মাসের [কিংবা প্রত্যেক মাসের শেষ তিন দিন কিংবা ততোধিক দিন সে রোজা রেখে এসেছে, তাহলে তার জন্য রোজা রাখাই উত্তম। পক্ষান্তরে যদি শুধু ঐ একদিন রোজা রাখার অভ্যাস হয়ে থাকে, তাহলে কোনো কোনো মতে বাহ্যত নিষেধ থেকে বেঁচে থাকার জন্য রোজা না রাখাই উত্তম। আর কোনো কোনো মতে হযরত আলী ও আয়েশা (রা.)-এর অনুসরণে রোজা রাখাই উত্তম। কেননা তাঁরা ঐ দিন রোজা রাখতেন। আর স্বীকৃত মত হলো, মুফতি [ও অন্যান্য বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিগণ। সতর্কতার খাতিরে নিজে রোজা রাখবেন, কিন্তু সাধারণ লোকদের মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর পানাহার করার ফতোয়া প্রদান করবেন। [নিজে গোপনে রোজা রাখবেন] অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকার জন্য।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
لَا يُصَامُ الْيَوْمِ তৃতীয় প্রকার হলো, সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজার নিয়ত করা। ঐ দিন নফল রোজা মাকরূহ নয়। কেননা। الَّذِي يُشَتُ فِيْهِ أَنَّهُ مِنْ رَمَضَانَ إِلَّا تَطَوُّعًا -এর মধ্যে নফল রোজাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন, সন্দেহপূর্ণ দিনে নতুনভাবে রোজা রাখা মাকরূহ। নতুনভাবে রোজা রাখার অর্থ হলো, সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখা তার পূর্ব অভ্যাস অনুযায়ী ছিল না এবং তার প্রতি মাসের শেষ দিনগুলোতে রোজা রাখারও অভ্যাস ছিল না। যেমন- সন্দেহপূর্ণ দিনটি হলো শনিবার। তার সোমবার এবং বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস ছিল এবং ঐ ব্যক্তির মাসের শেষ দিনগুলোর রোজা রাখারও অভ্যাস ছিল না। তবে এই শনিবার সকলের মতে সন্দেহপূর্ণ দিন। যদি সে ঐ দিন রোজা রাখে তবে তার এই রোজা ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে মাকরূহ। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলি لَا تَتَقَدَّمُوا رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ وَلَا بِصَوْمِ إِلَّا يَرْمَيْنِ إِلَّا أَنْ يَنكُونَ صَوْمًا يَصُومُهُ رَجُلُ রমজানের উপর এক কিংবা দুই রোজা অগ্রগামী করো না। তবে যদি তা রোজাদারের রোজা অনুযায়ী হয় যা সে রেখেছিল।" উক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। তবে যদি এই রোজা তার অভ্যাস অনুযায়ী হয়ে যায়। যেমন কারো অভ্যাস হলো, প্রতি বৃহস্পতিবার রোজা রাখার। ঘটনাক্রমে বৃহস্পতিবারই সন্দেহপূর্ণ দিন (يوم الشك) পড়ে গেল। তবে এ অবস্থায় সেদিন নফল রোজা রাখা মাকরূহ হবে না।
আমাদের দলিল হলো নিম্নোক্ত হাদীস - لَا صِيَامَ الْيَوْمَ الَّذِي الخ -এর মধ্যে إِلَّا تَطَوُّعًا বাক্যটি। কেননা, উক্ত হাদীসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজা রাখার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। চাই তা তার অভ্যাস অনুযায়ী হোক বা না হোক। সুতরাং উক্ত হাদীসটি তার ব্যাপকতার কারণে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর বিপক্ষে দলিল হবে। ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর পেশকৃত হাদীসের জবাব হলো, যে রোজাকে রমজানের উপর অগ্রগামী করতে নিষেধ করা হয়েছে তা রমজানের রোজা। অর্থাৎ রমজানের পূর্বে কোনো রোজা রমজান মনে করে না রাখা। কেননা যদি রমজানের পূর্বে রমজানের রোজা রাখা হয় তবে সময়ের পূর্বেই রোজা রাখা হয়ে যায়। আর রমজানের রোজা রমজান মাসের পূর্বে রাখার দ্বারা আদায় হবে না। হাদীসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়নি। এজন্য ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর "নতুনভাবে সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজা রাখা মাকরূহ বলা ঠিক হবে না।"
হিদায়া গ্রন্থকার বলেন, যদি এই নফল রোজা এমন দিনে পড়ে যায় যেদিনে রোজা রাখা তার অভ্যাস ছিল। তবে এই সুরতে রোজা রাখা সকলের মতে উত্তম। যেমন- সোমবার রোজা রাখা তার অভ্যাস ছিল বিধায় সে প্রত্যেক সোমবারে রোজা রাখতো। এখন ঘটনাক্রমে সন্দেহপূর্ণ দিনটিও সোমবারেই পড়ে গেল। ভবে এই দিনে নফল রোজা রাখা সকলের মতে উত্তম। এমনিভাবে যদি তার অভ্যাস প্রত্যেক মাসের শেষ তিনদিন কিংবা ততোধিক দিন রোজা রাখার হয়। এ সুরতেও সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজা রাখা উত্তম হবে। আর যদি সন্দেহপূর্ণ দিন তার অভ্যাস অনুযায়ী না পড়ে এবং তার প্রত্যেক মাসের শেষ তিনদিন কিংবা কমবেশি রোজা রাখার অভ্যাসও নেই; বরং এমনিতেই সন্দেহপূর্ণ দিনে নফল রোজা রাখে। তবে শায়খ মুহাম্মদ বিন সালামার মতে রোজা না রাখা উত্তম। যাতে প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা لَا يُصَامُ الْيَوْمُ الَّذِي يُشَدَّنِي বিমুখতা প্রকাশ পায়। নাসীর ইবনে ইয়াহইয়ার মতে রোজা রাখা উত্তম। দলিল, রোজা রাখার মধ্যে হযরত আলী ও আয়েশা (রা.)-এর অনুসরণ হয়ে থাকে। কেননা তাঁরা উভয়েই সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখতেন। আর বলতেন, শাবানের দিনে রোজা রাখা পছন্দনীয় রমজানের দিনে রোজা না রাখার তুলনায়। অর্থাৎ এ দিন যদি শাবানের দিন হয় তবে রোজা রাখতে কি অসুবিধা? কিন্তু যদি রমজানের দিন হয় আর আমরা রোজা না রাখি তবে রমজানের মধ্যে রোজা ভঙ্গ করা বুঝাবে। উল্লেখ্য যে, এটি একেবারেই অপছন্দনীয়। এজন্য এ দিনে রোজা রাখাও উত্তম। চাই তা সন্দেহপূর্ণ দিনটি। শাবানের দিন হোক বা রমজানের দিন হোক।
হিদায়া গ্রন্থকারের মতে গ্রহণযোগ্য মাজহাব হলো, মুফতি নিজে সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখবে, তাহলে সতর্কতার উপর আমল হয়ে যাবে। কিন্তু যেহেতু ঐ দিনে এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটি রমজানের দিন, সেহেতু মুফতি যদি ঐ দিন রোজা না রাখে তাহলে রমজানের মধ্যে ইফতার করার নামান্তর হবে। আর এটি সতর্কতা বিরোধী কাজ। তাই সতর্কতা রোজা রাখার মধ্যে নিহিত। তবে মুফতি সাধারণ লোকদেরকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ফতোয়া দেবে। যদি মধ্যাহ্ন পর্যন্ত চাঁদের প্রমাণ পাওয়া যায় তো তালো। নতুবা পুনরায় রোজা না রাখার ফতোয়া দেবেন। কেননা, এর দ্বারা অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকা যাবে। প্রথমত-এজন্যে যে, যেহেতু রাফিজীদের মতে সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখা ওয়াজিব। এখন যদি মুফতি সন্দেহপূর্ণ দিনে সাধারণ লোকদেরকে রোজা রাখার ফভোয়া দেয়, তবে দুনিয়ার লোকেরা মুফতিকে অপবাদ দেবে যে, দেখো! মুক্তি সাহেব রাফিজী হয়ে গেছে। এই অভিযোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে রোজা ভঙ্গের ফতোয়া দেবে। দ্বিতীয়ত রাসূলুল্লাহ (সা) সন্দেহপূর্ণ দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। লোকেরা হাদীসের পূর্ণ মর্ম তো বুঝবে না; বরং মুফতিকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরোধিতার অভিযোগ দেবে। এজন্য মুক্তির উচিত হবে সন্দেহপূর্ণ দিনে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর সাধারণ লোকদেরকে রোজা ভঙ্গের ফতোয়া দেওয়া।
والرابع: أن يضجع في أصل النية بأن ينوي أن يصوم غدا إن كان من رمضان ولا يصومه إن كان من شعبان وفي هذا الوجه لا يصير صائما لأنه لم يقطع عزيمته فصار كما إذا نوى أنه إن وجد غدا غذاء يفطر وإن لم يجد يصوم
والخامس: أن يضجع في وصف النية بأن ينوي إن كان غدا من رمضان يصوم عنه وإن كان من شعبان فعن واجب آخر وهذا مكروه لتردده بين أمرين مكروهين ثم إن ظهر أنه من رمضان أجزأه لعدم التردد في أصل النية وإن ظهر أنه من شعبان لا يجزيه عن واجب آخر لأن الجهة لم تثبت للتردد فيها وأصل النية لا يكفيه لكنه يكون تطوعا غير مضمون بالقضاء لشروعه فيه مسقطا وإن نوى عن رمضان إن كان غدا منه وعن التطوع إن كان من شعبان يكره لأنه ناو للفرض من وجه ثم إن ظهر أنه من رمضان أجزأه عنه لما مر وإن ظهر أنه من شعبان جاز عن نفله لأنه يتأدى بأصل النية ولو أفسده يجب أن لا يقضيه لدخول الإسقاط في عزيمته من وجه.
অনুবাদ: চতুর্থ প্রকার হলো, মূল নিয়তের মধ্যে দোদুল্যমান হওয়া। এভাবে নিয়ত করা যে, আগামীকাল রমজান হলে রোজা রাখবে। আর শাবান হলে রোজা রাখবে না। এভাবে সে রোজাদার হবে না। কেননা সে তার নিয়তকে স্থির করেনি। সুতরাং এমনই হলো, যেন সে নিয়ত করল যে, আগামীকাল যদি সে খাবার পায় তাহলে রোজা রাখবে না, আর খাবার না পেলে রোজা রাখবে। পঞ্চম প্রকার হলো, নিয়তের প্রকৃতির ক্ষেত্রে দ্বিধা পোষণ করা। অর্থাৎ এই নিয়ত করা যে, আগামীকাল রমজানের দিন হলে রমজানের রোজা রাখবে। আর শাবানের দিন হলে অন্য ওয়াজিব রোজা রাখবে। এটা মাকরূহ। কেননা সে দুটি মাকরূহ বিষয়ের মাঝে দোদুল্যমান রয়েছে। অতঃপর যদি প্রকাশ পায় যে, দিবসটি রমজানের দিবস, তাহলে ঐ রোজাই যথেষ্ট হবে। কেননা মূল নিয়তের ক্ষেত্রে তো কোনো দ্বিধা নেই। পক্ষান্তরে যদি প্রকাশ পায় যে, তা শাবানের দিবস, তাহলে এ রোজা অন্য কোনো ওয়াজিব রোজারূপে যথেষ্ট হবে না। কেননা দ্বিধান্বিত থাকার কারণে দিক নির্ধারিত হয়নি। আর মূল নিয়ত তার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে তা এমন নফল রোজায় রূপান্তরিত হবে, যা [ভঙ্গ করলে] কাজা জিম্মায় আসে না। কেননা সে তা শুরুই করেছে জিম্মা থেকে অব্যাহতির নিয়তে। আর যদি সে এই নিয়ত করে যে, আগামীকাল রমজান হলে তার রোজা রমজানের রোজা হবে, আর শাবান হলে নফল রোজা হবে, তাহলে তাও মাকরূহ। কেননা এক দিক থেকে সে [রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত করেছে। অতঃপর যদি প্রকাশ পায় যে, সে দিবসটি রমজানের দিবস, তাহলে তা রমজানের রোজা হিসেবে যথেষ্ট হবে। কারণ ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে [অর্থাৎ মূল নিয়তে কোনো দ্বিধা নেই]। আর যদি প্রকাশ পায় যে, তা শাবানের দিবস, তাহলে নফল হিসেবে তা জায়েজ হবে। কেননা নফল মূল নিয়তের দ্বারা আদায় হয়ে যায়। যদি তা ফাসেদ করে ফেলে তাহলে কাজা না হওয়াই উচিত। কেননা, তার নিয়তের মধ্যেই এক হিসেবে জিম্মা হতে অব্যাহতির লক্ষ্য বিদ্যমান।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
চতুর্থ প্রকার হলো, নিয়তকে রোজা রাখা-না রাখার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা অর্থাৎ সন্দেহপূর্ণ রাত্রে (اليلةُ يَوْمِ الشَّك) এই নিয়ত করা যে, যদি আগামীকাল রমজান হয় তবে রোজা রাখব। আর যদি শাবান হয় তবে রোজা রাখব না। এ ধরনের নিয়ত দ্বারা রোজা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা এ সুরতে তার নিয়ত অকাট্য নয়; বরং মূল নিয়তের মধ্যে দোদুল্যমান। যদি মূল নিয়তে সংশয় পাওয়া যায় তবে রোজা গ্রহণযোগ্য হয় না। যেমন- কেউ এই নিয়ত করল যে, যদি আগামীকাল খাবার পায় তবে রোজা রাখবে না। আর যদি খাবার না পায় তবে রোজা রাখবে। এই সুরতেও রোজা দূরস্ত হবে না। হ্যাঁ যদি সন্দেহপূর্ণ দিনে মধ্যাহ্নের পূর্বেই রমজানের চাঁদের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সে দৃঢ় নিয়ত করে নেয় তবে রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। আর যদি মধ্যাহ্নের পর চাঁদের প্রমাণ পাওয়া যায় তবে ঐ দিনের রোজা মূল নিয়তের মধ্যে সংশয়ের কারণে গ্রহণযোগ্য হবে না।
সন্দেহপূর্ণ দিনের রোজার পঞ্চম প্রকার হলো, নিয়তের প্রকৃতির মধ্যে সংশয় পোষণ করা। যেমন, এভাবে বলল, যদি আগামীকাল রমজানের দিন হয় তবে আমি রমজানের রোজা রাখব। আর যদি শাবানের দিন হয়, তবে অন্য ওয়াজিব অর্থাৎ কাজা কিংবা কাফফারার রোজা রাখব। এই সুরতটি মাকরূহ। কেননা, যে দুটি রোজার মাঝে নিয়তকে সম্পৃক্ত রেখেছে এতদুভয় রোজাই ঐ দিন মাকরূহ। অর্থাৎ সন্দেহপূর্ণ দিনে রমজানের রোজার নিয়ত করা যেমন মাকরূহ তদ্রূপ অন্য ওয়াজিবের নিয়ত করাও মাকরূহ। অতঃপর রোজা রাখার পর যদি প্রকাশ পায় যে, দিনটি রমজানের দিন ছিল তবে রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। কেননা মূল নিয়তের মধ্যে কোনো সংশয় পাওয়া যায়নি। আর রমজানের রোজা মূল নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। এজন্য এই নিয়ত দ্বারাও রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। আর যদি প্রকাশ পায় যে, দিনটি শাবানের দিন ছিল তবে অন্য ওয়াজিবের রোজা আদায় হবে না। কেননা নিয়তের প্রকৃতির মধ্যে সংশয়ের কারণে ওয়াজিব হওয়ার দিকটি প্রমাণিত হয়নি। তবে মূল নিয়ত পাওয়া গেছে। কিন্তু মূল নিয়ত অন্য ওয়াজিবের রোজা আদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, মূল নিয়তের দ্বারা অন্য কোনো ওয়াজিব রোজা নির্ধারণ হয় না। অথচ নির্ধারণ করা জরুরি। তবে এই রোজাটি এমন নফল হবে, যা ভঙ্গ করলে কাজা অপরিহার্য হবে না। অর্থাৎ যদি ঐ রোজা তঙ্গ করে তবে তার কাজা ওয়াজিব হবে না। কেননা সে এই রোজা এমন নিয়ত দ্বারা আরম্ভ করেছিল যার কারণে তার জিম্মা থেকে ওয়াজিব রহিত হয়ে যায় অর্থাৎ রমজানের রোজা আদায় হয়ে যায়। কিন্তু জানা গেল, তার জিম্মায় ওয়াজিব হয়নি। এ কারণে যে, রমজানের প্রমাণই হয়নি। সুতরাং তা তঙ্গের দ্বারা কাজা অপরিহার্য হবে না। কেননা এটিও ধারণাপ্রসূত রোজার ন্যায় হয়ে গেল।
আর যদি সন্দেহপূর্ণ দিনের রাত্রে এই নিয়ত করে যে, যদি আগামীকাল রোজা হয় তবে আমার রোজা রমজানের হবে আর যদি শাবান হয় তবে আমার রোজা নফল হবে- এটাও মাকরূহ। কেননা এই সুরতেও একদিক থেকে ফরজের নিয়ত পাওয়া গেছে, অথচ ঐ দিন ফরজের নিয়ত করা মাকরূহ। আর যদি পরে প্রকাশ পায় যে, ঐ দিন রমজানের ছিল তবে রমজানের রোজা আদায় হয়ে যাবে। কেননা মূল নিয়তের মধ্যে সংশয় পাওয়া যায়নি। আর যদি প্রকাশ পায় যে, ঐ দিন শাবানের ছিল তবে নফল রোজা হয়ে যাবে। কেননা, নফল রোজা মূল নিয়ত দ্বারা আদায় হয়ে যায়। যদি তা তঙ্গ করে দেয় তবে তার কাজা করতে হবে না। কেননা কাজা তখন ওয়াজিব হয় যখন নিয়তের মধ্যে দৃঢ়তা পাওয়া যায়। আর এখানে দৃঢ়তা নেই। কারণ যেখানে সে নফল রোজার নিয়ত করেছে তার সাথে সাথে তা রমজানের হওয়ার সুরতে নিজের জিম্মা থেকে ফরজের অব্যাহতিরও নিয়ত করেছে। সুতরাং এটাও ধারণাপ্রসূত রোজার সদৃশ হয়ে গেল। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধারণাপ্রসূত রোজা ভঙ্গ করলে তার কাজা ওয়াজিব হয় না।
No comments:
Post a Comment