Friday, March 15, 2024

সফরে দুই ওয়াক্তের নামায একসাথে আদায় করা - আদিল্লাতুল হানাফিয়্যাহ

(নিচের লেখাটি শায়খ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম আল-বাহলবী লিখিত ‘আদিল্লাতুল হানাফিয়্যাহ’ এর একটি অধ্যায় হতে নেওয়া হয়েছে)

অধ্যায়-২১১: সফরে দুই ওয়াক্তের নামায একসাথে আদায় করা

৬৬৮) নাফি’ ও আবদুল্লাহ ইবন ওয়াকিদের সূত্রে বর্ণিত, একদা হযরত ইবন উমার (রা.)’র মুআযযিন তাকে বললেন, নামায (এর সময় হয়ে গেছে)। তিনি বললেন, চল চল। অতঃপর তিনি পশ্চিমাকাশের সাদা বর্ণ দূরীভূত হওয়ার প্রাক্কালে বাহন থেকে অবতরণ করে মাগরিবের নামায আদায় করেন। এরপর সামান্য অপেক্ষা করে পশ্চিমাকাশের সাদা বর্ণ সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হলে তিনি ইশার নামায আদায় করেন। অতঃপর বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কোনো জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকলে তিনি এরূপ করতেন, যেরূপ আমি করেছি। তিনি সেই দিন ও রাতের সফরে তিন দিনের রাস্তা অতিক্রম করেন। (অর্থাৎ তিনি তড়িঘড়ি পথ অতিক্রম করেন)। (সুনানে আবু দাউদ)

৬৬৯) ইবন জাবির থেকে বর্ণিত, আমার নিকট নাফি’ বর্ণনা করে বলেন, আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)’র সঙ্গে তাঁর এক জমিনের উদ্দেশ্যে এক সফরে বের হলাম। তখন একজন আগুন্তক তাঁর নিকট এসে বলল, সাফিয়্যা বিনতে আবু উবাইদ অসুস্থ। অতএব আপনি তাঁর সাক্ষাতের ব্যাপারে চিন্তা করুন। ফলে তিনি কুরাইশের জনৈক ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে বের হয়ে দ্রুত সফর করতে লাগলেন। ইতোমধ্যে সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল, কিন্তু তিনি নামায পড়লেন না। অথচ তাঁর ব্যপারে অভিজ্ঞতা-ধারণা ছিল যে, তিনি নামাযের বিষয়ে (খুবই) যত্নশীল। তো যখন তিনি দেরি করে ফেললেন তখন আমি বললাম, নামায (এর প্রতি লক্ষ্য রাখুন) আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আবার চলতে লাগলেন। অবশেষে যখন তিনি লালীমার শেষপর্যায়ে উপনীত হলেন, তখন (বাহনযন্তু থেকে) নেমে মাগরিবের সালাত পড়লেন। তারপর তিনি ইশার ইকামত দিলেন; তখন লালীমা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। তো আমাদের নিয়ে তিনি নামায আদায় করলেন। এরপর তিনি আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যখন কোনো জিনিস তাড়া দিত তখন তিনি এরূপ করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ) এর সনদ সহীহ।

৬৭০) হযরত আবু উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি ও সা’দ বিন মালিক (রা.) গমন করলাম। আমরা হজ্জের উদ্দেশ্যে দ্রুত চলছিলাম। তাই যুহর ও আসর একত্রে আদায় করতাম; একটাকে (আসরকে) শুরুতে নিয়ে আসতাম আর অন্যটাকে (যুহরকে) পিছিয়ে দিতাম। এভাবে আমরা মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতাম; একটাকে (ইশাকে) শুরুতে নিয়ে আসতাম আর অন্যটাকে (মাগরিবকে) পিছিয়ে দিতাম। অবশেষে আমরা মক্কায় এসে গেলাম। (শারহু মাআনিল আসার; তাহাবি) এর সনদ সহীহ।

৬৭১) আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন উমার ইবন আলী ইবন আবি তালিব তাঁর পিতার সূত্রে তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.) যখন সফরে বের হতেন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর, এমনকি অন্ধকার হওয়ার উপক্রম হয়ে যেত, অতঃপর তিনি বাহনযন্তু থেকে নেমে মাগরিব আদায় করতেন। তারপর রাতের খাবার নিয়ে আসতে বলতেন, খাবার খেয়ে ইশার নামায আদায় করতেন। তারপর সফর শুরু করতেন এবং বলতেন, রাসূল (সা) এভাবে করতেন। (সুনানে আবু দাউদ) এর সনদ সহীহ।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা: দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে এক ওয়াক্তে আদায় করাকে জমা বাইনাস সালাতাইন বলে। আইম্মায়ে সালাসার মতে (আনুসাঙ্গিক কিছু মতানৈক্য থাকলেও) উযরবশত জমা বাইনাস সালাতাইন জায়িয। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে আরাফা ও মুযদালিফায় হজ্জের সময় আসর ও যুহর এবং মাগরিব ও ইশার ক্ষেত্রে জায়িজ হলেও অন্য কোনো ক্ষেত্রে হাকিকি (বাস্তবিক) জমা বাইনাস সালাতাইন জায়িজ নয়। তবে জাময়ে সূরি (বাহ্যিক) জমা তথা এক নামাযকে তার শেষ ওয়াক্তে এবং অন্য নামাযকে ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করা জায়িজ আছে। বর্তমান সময়ের গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুরাও ব্যাপকভাবে জমা বাইনাস সালাতাইনের প্রচার ও প্রয়োগ করে চলেছেন। হানাফিদের পক্ষে এখানে দলিল উপস্থাপিত হয়েছে। এগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, হাদিসে আলোচিত জমা দ্বারা জাময়ে সূরিই উদ্দেশ্য।

ইসতি’নাস: আল্লামা শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১২৫৫ হি.) লিখেছেন, এ কথা দলীল দ্বারা প্রমাণিত যে, হাদীসের মধ্যে জমা বাইনাস সালাতাইন (দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে আদায় করা) দিয়ে জময়ে সূরী (বাহ্যত একত্রীকরণ) উদ্দেশ্য। এর উপর বিস্তর আলোচনা করে তিনি লিখেন, সুতরাং জমা দ্বারা জময়ে সূরী অর্থ নেয়াই উত্তম। বরং পূর্বের আলোচনা থেকে এটিই একমাত্র সঠিক মত বুঝা যায়। (নাইলুল আওতার, ৩/২৬৬-২৬৮, দারু এহইয়াত তুরাসিল আরাবী ১৯৭৩ঈ)

সহীহ হাদীসে জমা বাইনাস সালাতাইনের কথা বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং রাসূল (সা) জমা বাইনাস সালাতাইন (দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে আদায়) করেছেন। সালাফী বন্ধুরা মনে করেন এখানে জমা দ্বারা হাকীকী জমা উদ্দেশ্য, তাই দু’ওয়াক্তের নামায ক্ষেত্র বিশেষে এক ওয়াক্তে একত্রে আদায় করা যাবে। আর হানাফীরা বলেন, হাদীসে জমা দ্বারা জময়ে সূরী উদ্দেশ্য, তাই দু’ওয়াক্তের নামায ক্ষেত্র বিশেষ এক ওয়াক্তে একত্রে আদায় করা যাবে। আর হানাফীরা বলেন হাদীসে জমা দ্বারা জাময়ে সূরী উদ্দেশ্য, মানে এক নামায তার ওয়াক্তের শেষভাগে এবং অন্য নামায ওয়াক্তের প্রথমভাবে আদায় করে নেয়া, যাতে বাহ্যিকভাবে দু’নামাযকে একত্রে আদায় করা বুঝা যায়। হানাফিদের এই ব্যাখ্যা ওপর অনেক দলীল প্রমাণ বিদ্যমান, এখানে এগুলো উল্লেখ করার অবকাশ নেই। শুধু এতটুকু বলে রাখি, সালাফী ভাইদের বরণীয় ব্যক্তিত্ব, তাদের গুরুজন আল্লামা শাওকানী (রাহি.)ও কিন্তু এক্ষেত্রে হানাফীদের পক্ষে রায় পেশ করেছেন। কেননা অন্যান্য বিষয়ের মতো এখানেও হানাফীদের দলীল খুবই পরিস্কার, সঠিক ও সুদৃঢ়।


আরবী অংশ:











No comments:

Post a Comment